বেলা ডোবার গল্প
মিনার মাহমুদকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে বাংলাদেশ প্রতিদিনে শ্রদ্ধেয় পীর হাবিবুর রহমানের ‘সুপার স্টারের ট্রাজিক বিদায়-২ এপ্রিল’,সমকালে ফরিদুর রহমান সাগরের-‘উজ্জীবিত তারুণ্য -২ এপ্রিল’, ও প্রথম আলোর মোনায়েম খানের- গণমাধ্যম: যৌবনের স্বপ্ন হারিয়ে গেল-৩১ মার্চ’কলামগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে কয়েকদিন ধরেই পড়ে আসছিলাম। ভাবছিলাম কিছু লিখব। দেশের শেষ উত্তরপ্রামেত্ম সীমামেত্মর কূল ঘেষা হিমালয় কন্যা তেঁতুলিয়া বাস করি। আশি দশকের একজন প্রতিভাবান,উদ্যমী,ভীষণ সাহসী,স্বৈরশাসনের সাড়া জাগানো আলোচিত-সমালোচিত মিনার মাহমুদ। দু’কলম লেখার জন্য মনটা খুবই উৎপাত শুরু করে দিয়েছে ৩০ মার্চ থেকেই। লিখেও ফেললাম একটি প্রবন্ধ। কিন্তু কম্পিউটারের আইকনে ফাইলটা থাকায় হঠাৎ কম্পিউটার বন্ধ হয়ে যায়। নতুন করে সেটাপ দিতে গিয়ে ফাইলটি হারাতে হয়। পুনরায় লিখতে বসি। ১১ এপ্রিল ঠিক যখন শেষ বিকেলের সুর্যটা ডুবু ডুবু, ঠিক তখনি বাংলাদেশ প্রতিদিন আমার হাতে পৌছে। বেলা ডোবার শেষ মুহুর্তে চোখে পড়লো-‘আমি সর্বহারা,নিজেকে খুন করে ফেললাম’ প্রতিবেদনটি। হৃদয় নড়ে উঠলো,চোখ উঠে এলো অস্বাভাবিক অবস্থায় উপরের দিকে। বুক ধরফর। ব্যর্থতার আত্মভিমানের পরাজয়ের পরিণাম কি তাহলে আত্মহনন! বাকরুদ্ধ হয়েই কয়েকবার পড়ে নিলাম লেখাটি। লেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে হাতে কলম আসতেই স্মৃতি নিয়ে ফিরলো একটি পিছনের দিকে।
প্রতিদিনই বেলা উঠে ভোর বেলায়। ডোবে যায় সন্ধ্যায়। মাঝখানে অতিবাহিত হয় একটি আলোর ঝলমলে কয়েকটি ঘন্টা। একটি দিন। এই একটি দিনে পৃথিবীতে ঘটে অনেক কিছু। কারও জন্ম হয়, কারও হয় মৃত্যু। এভাবেই এক একটি দিনকে রাত এসে গোগ্রাসে গিলে ফেলে। অন্ধকার নামে চারদিকে। প্রকৃতির বুক তখন আঁধারে ঢাকা। আবার আঁধারকে আলোর ছায়া ফেলে দুরে ফেলে দেয়। রাত দিনের সময় নিয়ে ডিউটি। এক মিনিটও হেরফের হয় না। সময় মত দায়িত্বপালন। বেলা উঠে বেলা ডুবে। রাত যায় দিন আসে। সময় এগিয়ে যায়,পিছনে ফেলে জীবের বয়স। শিশু বেড়ে নানা রম্নপ বদল করে। সবুজ পাতার গায়ে আসেত্ম আসেত্ম হলুদাভ রং এসে মিশে। একসময় ঝরে যায়। নওজোয়ান বৃদ্ধ হয়। রক্তিম-হলুদ পাতার মত সেও একসময় ঝরে পড়ে জীবন থেকে। জীবন হারিয়ে যায়। দাঁড়িয়ে থাকে বৃÿÿর মত পৃথিবীটা। এই আসা-যাওয়ার মধ্য দিয়ে চলতে থাকে সময়। যেটা শুরম্ন হয়,সেটা শেষ হতে সময় লাগে। অপেক্ষা করে না কোন কিছু।
মাঝে মাঝে খসে পড়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র। ঝরে পড়ে সবুজ পাতাও। যাকে আমরা অকাল প্রয়াত বলি। অবিশ্বাস্য চোখে নেত্র ভিজিয়ে আবেগে নড়ি। কিছুদিন মনে করি। যারা লিখনির শক্তি নিয়ে জীবনের পথে হাটি। তারা হয়তো কিছু লেখার চেষ্টা করি। ঝরা পাতার আর্তনাত তুলে ধরি। আর্তনাতে বিচলিত হই,আহত হই। ব্যথিত মনে অপলক শ্যূন দৃষ্টিতে মন নিবদ্ধ করি। প্রিয়জন অকালে চলার বেদনায় দু’চোখের জলের সাথে কষ্ট দূর করার চেষ্টা করি। ভাবতে থাকি জীবন থেমে যায় কেন? জীবন এত বিচিত্র কেন? ছোট কেন? প্রশ্ন উদ্ভাবিত হতে থাকে উত্তর মিলেনা কখনো কখনো। যোগফল কখনো ঠিক হয়,কখনো হয় এলোমেলো। যোগফল মিলাতে পারেননি হয়তো মিনার মাহমুদও। আশি দশকে উজ্জ্বল নক্ষত্র। আত্মভিমানে চলে গেলেন জীবন থেকে। এখানেই জীবনের অংক ভুল। হিসাব গড়মিল। যে জীবন হারিয়ে যায়,সেটা হয়তো আর ফিরে পাওয়া যায়না। যে যুবক বৃদ্ধ হয় সে আর কখনো যুবক হয়। যে শিশু তরম্নণ হয় সে কখনো শিশু হয়না। হয়তো আচরণগত বৈশিষ্ট মিশে থাকে। অভ্যাস থেকে যায়। অভ্যাস মানুষের দাস। শৈশব জীবনের অভ্যাসও বৃদ্ধকালে উদ্ভাসিত হতে পারে। অস্বাভাবিক কিছু না। কিন্তু নিয়তিকে মাঝে মাঝে অস্বাভাবিক বলে মনে হয়। অকাল মৃত্যুর নিয়তিকে দোষারোপ করি আমরা আবেগের তাড়নায়। মেনে নিতে পারিনা এই অকাল প্রয়াত বিষয়টা। সাগরের ঢেউ যেমন ছন্দ-খেলায় দোলায়িত হয়,ঠিক তেমনি মানুষের জীবনও নানা ছন্দ-পতনের মাঝে খেলা করে। জীবনের সূর্য উঠে,অসত্ম যায় বেলা ডোবার মধ্য দিয়ে। মিনার মাহমুদের আত্মভিমানের বেলা ডোবার গল্পটা আমাকে না শুধু,যারা সাহিত্যে,সংবাদে নিয়োজিত তাদেরকেও ভাবিয়েছে অনেকবার। প্রশ্নের ঢেউয়ে হতাশ,অবিশ্বাস্য করে তুলেছে বারংবার।
৩০ মার্চ দেশের প্রিন্ট মিডিয়া ও অনলাইন মিডিয়াতে হতবাক হয়ে দৃষ্টি ফেলে দেখেছি মিনার মাহমুদ আর নেই। আত্মভিমানে ধ্বংস করেছে স্বীয় জীবন। বিশ্বাসই হচ্ছিল না একজন দেশের প্রিন্ট মিডিয়ার আশি দশকের সাড়া জাগানো আলোচিত-সমালোচিত একজন প্রতিভাবানের আত্মহননের মৃত্যু! আমি হয়তো দেখিনি স্বচক্ষে মিনার মাহমুদকে। কেননা আশি দশকের প্রারম্ভেই আমার প্রথম পৃথিবীতে আগমন। তবে নববই উনার নাম শুনেছি। টেলিভিশনে প্রচার শুনেছি। দেখিনি অথচ মনে গেঁথে আছে এক অদ্ভুত যেন আত্মিক সম্পর্ক। কতযে আপন। সেদিন (৩১মার্চ) প্রথম আলোয় সম্পাদকীয় পাতায় পল্লব মোহাইমেন এর ‘যৌবনের স্বপ্ন হারিয়ে গেল’ শিরোনামের লেখাটা বেশ কয়েকবার ভারাক্রামত্ম হৃদয় নিয়ে পড়েছি। চোখের কিনারে মিনার মাহমুদের মৃত্যুতে জল পড়ার শব্দ অনুভব করেছি। কেঁদেছি অজামেত্মর এক আজন্ম ভালবাসার সিক্ত অনুভবে। পলস্নব মোহাইমেন কয়েকটি মিনার মাহমুদের স্মৃতি চারণ করতে লিখেছেন-১.‘মিনার মাহমুদের লেখা আমাদের মধ্যে সাংবাদিকতা করার অনুপ্রেরণা জোগায়। তাঁর কাটা কাটা বাক্য, ঝর ঝরে অকপট লেখা পড়ে দ্রোহের আঁচ পাই। যে মানুষটি লেখায় দ্রোহের আঁচ বিস্ফোরণ করতে পারেন। নির্ভীক সাহসিকতায় স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে কলম ধরে মূল সাংবাদিকতার মূলমন্ত্র জানিয়ে দ্বীক্ষা দিতে পারেন। বিচিত্রা দিয়ে যাত্রা শুরু,এরপর ‘বিচিমত্মা’; যাত্রাটা শুরু হয়েছিল দূর্যোগ ঝড়ের মধ্য দিয়েই। বাঁধা পদে পদে। স্বৈরাচারীর আক্রোশে ১৯৮৮ সালে ‘বিচিমত্মা’নিষিদ্ধতায় কারাগার বরন। সাহস তার স্ফুলিঙ্গ। বারুদের মত জ্বলে উঠেই বিস্ফোরণ ঘটায়। এই দূর্জয় সাহসী কলম যোদ্ধার কথা ১ এপ্রিলের সমকালের মুক্তমঞ্চ ৫ পাতায় ‘অম্লান দেওয়ানের ‘মিনার ভাই : যদ্যপি আমার গুরু’লেখাটায় টনক নড়লো। তিনি স্মৃতিচারণ করতে উল্লেখ করেছেন-‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকাকালে যোগ দেন সাপ্তাহিক বিচিত্রায়। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রিপোর্ট ছাপতে গিয়ে কাভারে একটি সন্ত্রাসীর মডেল প্রয়োজন হয়। অনেক খোঁজাখুজির পর ঝামেলায় পড়বেন এ ভয়ে কেউ মডেল হতে রাজি হচ্ছিলেন না। মিনার মাহমুদ নিজেই দাঁড়িয়ে পড়লেন রাজপথে। মাথায় গামছা,হাতে হকিস্টিক,পরনে জিন্স প্যান্ট,রোদের তাপের শরীর থেকে ঝরছে ঘাম। নিজের রিপোর্টের মডেল হলেন নিজেই। এসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্ত্রের রাজনীতি,ইমদু,গালকাটা কামালসহ দুধর্ষ সন্ত্রাসীদের জীবনচিত্র,মহসীন হলের আলোচিত সেভেন মার্ডার,বানীশামত্মা পতিতালয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচিত সব অনুসন্ধানী রিপোর্ট তৈরি করেন তিনি’।
সাংবাদিকার পদাচরণে স্বপ্ন যার নতুন প্রজন্মকে সাংবাদিক করে গড়ে তোলার। আজকে ফজলুল বারী,মাসুক হেলাল,অম্লান দেওয়ানসহ আজকের খ্যাতবান সাংবাদিক যার হাত ধরে আসা,সেই মিনার মাহমুদের জায়গায় হয়নি প্রযুক্তির এই যুগে হাজারও টিভি মিডিয়া,প্রিন্টমিডিয়া থাকা স্বত্বেও। কি আপছোস! কী এক নির্মম হতাশা! বিধ্বসত্ম হৃদয়। বুক ভরা আর্তনাতের বিষক্রিড়ায় বেছে নেন শেষ পরিণতি। যার প্রসঙ্গ তুলে হয়তো পলস্নব মোহাইমেন লিখলেন-মিনার মাহমুদের মৃত্যু শুধু তুখোর এক মৃত্যু নয়,এ এক স্বপ্নের হারিয়ে যাওয়া। প্রচন্ড অভিমানে চলে যাওয়া। স্রোতে গা ভাসিয়ে হয়তো নিজের স্বপ্নকে বন্দরে নোঙর করাতে পারতেন। কিন্তু মিনার মাহমুদ তো সেই মানুষ নয়। তাই হয়তো ‘স্বপ্নবান এক নায়ক ধীরে ধীরে তলিয়ে যেতে থাকেন হতাশার চোরাবালিতে’। প্রকৃতির লীলাভূমিতে ধরা পড়ে অনেক কিছুই। নানা গল্প থাকে জীবনের। জীবন চলে স্রোতসীনীর প্রবাহমান জলের গতিধারায়। নদীর জল কখনো পিছনে ফিরে না, ফিরে না তেমনি কালের চলমান সময়ের গতিও। এভাবে পূর্বের উদিত সূর্য সারাদিন পর বিদায় নেয় দিন থেকে। রাত তাকে গিলে ফেলে কালো আঁধারে। কিন্তু জীবনের গল্প দিনের ঝলমলে আলোর মত দাজ্জ্বল্যমান থাকে। স্বপ্নের নায়কের ‘স্বপ্নের সমুদ্রযাত্রা’ ৪ এপ্রিল বাংলাদেশ প্রতিদিনের আব্দুল মান্নানের ‘একি করলেন মিনার মাহমুদ’ শিরোনামের স্মৃতিচারণিত লেখাটা পড়ে। একটা দিনের যেমন অনেক কিছু ঘটনা থাকে,তেমনি থাকে একটি জীবনের নানা ঘটনা সংবলিত,সংকলিত গল্প। বৈচিত্র্যময় জীবনের বিচরনচারী ছিলেন এই মিনার মাহমুদ। দেখতে সুদর্শন। ভারত চলচ্চিত্রের বিগ বচ্চনের মুখের আকৃতিটা যেন কেঁড়ে নিয়েছিলেন। বন্ধুরা বাংলাদেশী অমিতাভ বচ্চন বলেই ডাকাডাকিতে মজা মেতে উঠতেন।স্মৃতি রয়ে যায়। স্মৃতি মরে না। সেই স্মৃতির পাতায় মিনার মাহমুদের ছবি কাগজের পাতায় শোভা পায়। কিন্তু কর্মের মূল্যায়ন হয়েছে হয়তো,কিন্তু কোথাও স্থান হয়নি স্থায়ীভাবে কোন মাল্টিমিডিয়া কিংবা বৃহৎ প্রিন্টমিডিয়াতেও। স্বপ্ন ভঙ্গ খেলায় কতটা টিকে থাকা যায়! এরই আত্মভিমানে জীবনের ইতিটানাই কী শেষ পরিণতি!
বিশ্বের অনেক প্রতিভাবান ও স্বনামধন্য ব্যক্তিরাও আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন। ধ্বংস করেছেন স্বীয় হসেত্ম নিজের মূল্যবান জীবন। জীবনের অস্থিরতা,ব্যর্থতা,হতাশাগ্রসত্মতা,বিষাদময়টাই যেন জীবন নাশের মূল কারণ। হেনরী জেমস্ বলেছিলেন-‘জীবন প্রকৃত প্রকৃত এক যুদ্ধ,এখানে মন্দ অতি শক্তিশালী ও উদ্ধত,সৌন্দর্য মনোমুগ্ধকর হলেও দূর্লভ; শুভত্ব যেন বাসত্মবিকই দূর্বল,কান্ডজ্ঞানহীনতাও বেপরোয়া,সবসময়ই চাতুর্যের ভেলা; আহাম্মকরাই এখানে শ্রেষ্ঠ জায়গায় অধীন,প্রকৃত বোধসম্পন্ন লোক নেই বললেই চলে; মানুষ মাত্রই অসুখী,কিন্তু পৃথিবী অলীক কোন কিছু নয়,কোন বিভ্রম নয়,রাতের কোন খারাপ স্বপ্নও নয়; মানুষ এরই মধ্যেই বেঁচে উঠে বারবার,মানুষ না পারে একে ভূলতে,না পারে অস্বীকার করতে,না পারে পরিহার করতে।’
দার্শনিক হিবটগেনস্টাইন? যার তিন ভাই হান্স,কুট ও রুডলফ্ আত্মহত্যা করেছিল। জীবনের প্রতি বিরোধাভাসের ছলে বলেছিলেন-ÔIf suicide is allowed then everything is allowed.if everthing is not allowed then suicide is not allowed.This throse a light on a nature of ethice,for suicide is,so to speak, the elementery sin,And when one investigating murcury vapours in order to investigate the nature of vapours.
আজকে মিনার মাহমুদ ২৯ মার্চ আত্মহননের পূর্বমুহুর্তে তার স্ত্রী ডা.লাইজুকে পাঁচ পৃষ্ঠার ৭০০ শব্দের চিঠি লিখে যান। তা আজ ১১ এপ্রিল বাংলাদেশ প্রতিদিন ডেক্স-‘আমি সর্বহারা,নিজেকে খুন করে ফেললাম’ শীর্ষক আবেগময় চিঠিটি পড়ে বেশ কয়েকবার চোখের জল ঝরেছে আমারও। তিনি চিঠিতে এক জায়গায় লিখেছেন-‘লাজুক,বেশ কয়েকদিন ধরে চিমত্মা করছি-মৃত্যু। তারপর কোথায়? এরপর কি জীবনে আর কোন ফিরে পাওয়া। খুব অবাক হয়েছি,বাংলাদেশের কোন দৈনিক পত্রিকায় আমার স্থান হলো না। বিচিমত্মা দিয়ে শুরম্ন করেছিলাম একদল তরম্নণ নিয়ে। বিরাট এক ঝুঁকি। কোন পত্রিকা নেয় না। আমি নিয়ে নিয়েছিলাম। খুব,খুব কষ্ট পেয়েছি,অপমানিত হয়েছি। যুগকে বিশ্বাস করো,বাংলাদেশের সাংবাদিকতার নতুন ধারা যারা তৈরি করেছে তাদের একজন আমিও’।
আমি মিনার,যখন আমেরিকা থেকে দেশে ফেরার সিদ্ধামত্ম নিই,শুনে সবাই অবাক। প্রশ্ন করে, বাংলাদেশে কেন যাচ্ছি। আমি অবাক হই,নিজের দেশে ফিরে যাচ্ছি-এটা নিয়ে প্রশ্ন কেন? কোথায় যাব তাহলে? মিনার মাহমুদের এই শেষাংশ কথাগুলো আমার কচি হৃদয়কে ভাবিয়েছে অনেকবার। তার এই চিঠি কয়েকবার পাঠ করে ফের পড়তে চেয়েছি। ফিরে গিয়েছি ইতিহাসের পাতার দিকে। ১৯৮৩ সালে ১ মার্চ আর্থার কোয়েসলার তার স্ত্রী সিনথিয়াসহ একসংগে আত্মহত্যা করেন। অ্যালকোহলের সঙ্গে অতিরিক্ত মাত্রায় বারবিটিউরেটস পান করেন। আত্মহত্যা বিষয়ক দীর্ঘ একটি নোটের এক অংশে তিনি লিখেছিলেন- ‘আত্মহত্যার প্রচেষ্টা মূলত এক ধরণের জুয়া খেলা, যার ফল কেবল তখনই জানা যায় যখন প্রচেষ্টাটি ব্যর্থ হয়, কিন্তু সফল হলে জানা সম্ভব নয়। এই উদ্যোগটিকে কি ব্যর্থ হতে দেওয়া উচিত?’ এই আত্মহত্যার জুয়া খেলার মত্ত হয়ে কি মায়াকোভস্কি ১৯৩০ সালের ১৪ এপ্রিলের এক সন্ধ্যায় আত্মহত্যার পূর্বে একটি অসমাপ্ত কবিতায় লিখে যান-`And so the say-/`the incident dissoloved’/ the love boat smashed up/ on the dreary routine./I’m through with life/and [we]should absolve/ from mutual hurts, afflictions and spleen. মিনার মাহমুদও তাই করলেন। শ্রদ্ধেয় ফরিদুর রেজা সাগর ‘উজ্জীবিত তারুণ্য’ এক জায়গায় বললেন-‘মিনার সব সময় সুশোভন সুন্দর হোটেল ভালবাসত। আজকের মৃত্যুটা সে বেছে নিল এক নিভৃক তারকা হোটেলেই। হোটেলে মানুষ আসে যায়। থাকে না। পৃথিবীটাও কি ছিল মিনারের জন্য একটি হোটেল? (২এপ্রিল-সমকাল)।
শ্রদ্ধেয় পীর হাবিবুর রহমান মিনার মাহমুদকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে ‘সুপারস্টারের ট্র্যাজিক বিদায়’শীর্ষক খোলাকলামে অনেক গুরুত্বপূর্ণ চিত্রগুলো তুলে ধরেছেন। এক জায়গায় বলেছেন- ‘পৃথিবীর সৃষ্টিশীল মানুষরা যতই কাজ করম্নক এক ধরণের অমত্মহীন তৃষ্ণা আর বেদনা নিয়ে পৃথিবী থেকে চলে যায়। একটি রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রুপ না পেলে, সমাজ শক্তিশালী গণতান্ত্রিক চেতনা ও মূল্যবোধের ওপর দাঁড়াতে না পারলে মিনার মাহমুদের মত অদম্য সাহসী,স্বাধীনতাপ্রিয় সৃষ্টিশীল মানুষদের অমত্মহীন যাতনা সয়ে যেতে হয়। আপস না করে জলার প্রবণতা তাদের একা করে দেয়। মিনার মাহমুদ সেই একাকিত্ব ও অসহায়ত্বের সংগ্রামে হেরে গিয়ে জীবন থেকে মুক্তি চেয়েছেন আত্মহননের পথে। লড়াই করে ঘুরে দাঁড়ানোর অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেন নি। পশ্চিমা দুনিয়া বাদ দিলেও গণতান্ত্রিক ভারতও লেখক-সাংবাদিকদের জন্য উপযুক্ত জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ (বাংলাদেশ প্রতিদিন: ২এপ্রিল/১২)। আসলে মানুষ মারা যায়। কিন্তু তার স্মৃতি,সৃষ্টি বিনাশ হয়না। কর্ম বেঁচে থাকে অনেক অনেক কাল পর্যমত্ম। কিন্তু অর্জিত সম্পদ নিজের করে রাখতে পারে না এই ইহজাগতিক পার্থিব ÿণস্থায়ী পৃথিবীতে। পৃথিবীর ভূ-মন্ডল,বায়ুমন্ডল,বারিমন্ডল কোন জায়গাতেই ফাঁকা নেই। একজন চলে যায় আরেকজন এসে সে ফাঁকা স্থান পূরণ করে। মিনার মাহমুদের হাতে গড়া সেদিনকার ৮০ দশকের যেসব তরুণ কলম ধরতে শিখেছিল, শিখেছিল সাংবাদিকতার মূলমন্ত্রটি। সেই অর্জিত সম্পদের সুফল ভোগ করতে পারেননি মিনার মাহমুদ দেশের প্রযুক্তির ছোঁয়ায় হাজারও মিডিয়া থাকা স্বত্ত্বেও। তাই হয়তো আক্ষেপ করেই পীর হাবিবুর রহমান বললেন- ‘গণতন্ত্রের জমানায় দলকানা দাসদের জয় হয়েছে, মিনার মাহমুদের খবর কেউ রাখেনি। এখন মানিক মিয়া, জহুর চৌধুরীদের উত্তরাধিকারই মেলেনা। মিনারদের জায়গা হয় কীভাবে?
শ্রদ্ধেয় পীর হাবিবুরের উলেস্নখিত স্মৃতিচারন লেখা পড়্যে বিশ্ব কবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ কবিতার কথা মনে পড়ে গেল। বিশ্ব কবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর যেন বেলার ডুবার কষ্টটা কল্পনা ডুবেও বাসত্মব চোখে অনুভব করেছিলেন। জীবনের অর্জিত ফসল পৃথিবীর বুকে রেখেই চলে যেতে হয়। কিন্তু নিজের হয়না। ঠাঁই হয়না নিজেরও। তাই জীবন নামক তরীটাকে বিশ্ব কবি রবিন্দ্রনাথ স্বার্থপরতাকে রুপকধর্মী কবিতাতে নিগুঢ়ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন-‘‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই-ছোট সে তরী/আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি/শ্রাবণগগন ঘিরে/ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে/শুন্য নদীর তীরে/রহিনু পড়ি-/ যাহা ছিল নিয়ে সোনার তরী’’।‘
‘এই আসা-যাওয়ার মাঝখানে এমন এক ঝলক দিয়ে গেল মিনার। দূর থেকে কুতুব মিনারের মাথা দেখে পর্যটক যেমন স্থানটিতে চিহৃিত করে এগিয়ে যান, এদেশের তারম্নণ্যদীপ্ত সাংবাদিকতাকেও সেই চিহ্ন বহুদূর থেকে দীর্ঘকাল দেখা যাবে ’(ফরিদুর রেজা সাগর: উজ্জীবিত তারুণ্য-২এপ্রিল,সমকাল)। দেখা যাবে প্রতিদিন বেলা ডোবার মুহুর্তে পশ্চিমাকাশে লাল আভাটুকুও।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন