আমরা কি ভয়াবহ দুর্যোগের দিকে এগুচ্ছি!
ঘটনার দিকে তাকালে যেন ফোসকা পড়ে যাচ্ছে দুচোখে। ঝলসে যাওয়ার মতো অনুভব হচ্ছে সমস্ত শরীর ও হৃদপিন্ড। কোথায় গিয়ে দাঁড়ালে নিরাপত্তা পাওয়া যাবে? বাক স্বাধীনতায় কথা বলা যাবে? সে পরিস্থিতি এখন আর নেই। বর্তমান সময়টাকে মনে হচ্ছে সিডর কিংবা নার্গিস ঝড়ের তান্ডবের চেয়েও ভয়াবহ আঘাত হানা প্রলংকরী থাবা। এটা দ্বিপদী মানুষের থাবা। জাতি শত্রুদের থেকে বেঁচে থাকা খুব কঠিন। সেই ক্ষেত্রে এদেশের সাধারন জনগণ যেন প্রবেশ করছে অনিশ্চিত এক ভয়াবহ অন্ধকার জগতের দিকে। চারদিকে ঝলসে দেওয়া আগুনের লেলিহান শিখা। ঘর পুড়ছে,গাড়ি পুড়ছে,ধর্মিকদের মন্দির পুড়ছে আর পাখির মতো গুলি খেয়ে ধপাধপ ঝরে পড়ছে সাধারণ জনগণের লাশ।
প্রশ্ন ওঠে-এটা কি অকারণে মানুষ হত্যার দেশ? এটা কি ধ্বংসযজ্ঞের রাষ্ট্র!! বলতে দ্বিধা নেই; নিশ্চিত আমরা এখন ভয়াবহ অগ্নিকুপের দিকে পৌঁছে যাচ্ছি। এটাই আমাদের জন্য দুনিয়াবি জাহান্নাম! মহান সৃষ্টিকর্তা রাগান্বিত হয়ে অদৃশ্য থেকে ছুঁড়ে দিতে যাচ্ছেন অভিশপ্ত গজব! বোঝা কঠিন আজকের দিনের পর কালকের দিনটিতে কি ঘটতে যাচ্ছ?
মনে হচ্ছে বিশাল ভয়ংকর এক কৃষ্ণ গহবর আমাদের দিকে হা করে গিলে খেতে দাজ্জালের মতো ধেয়ে আসছে। আমরা পালাতে চেষ্টা করছি কিন্তু বেড়িতে পড়ে যাচ্ছি হন্টক কিংবা আইন শৃংখলাবাহিনীর হাতে। তদন্ত পরে, রিমান্ডে শারিরিক ও মানসিক অত্যাচারের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। কেননা মিথ্যার ফাঁদে পড়লে মিথ্যা মামলায় এসবের ভোগান্তিতে পড়তে হবে এতে কোন সন্দেহ নেই।
হরতালে দেশের অবস্থা বারটার জায়গা তেরটা। অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি; জানমালের অনিরাপত্তা, বাজারের উর্ধ্বগতি আর জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে ভীষণ এক মহা যন্ত্রণা নির্ভর পরিস্থিতিতে সময় কাটাচ্ছি। কেউ কেউ হা-করে নি:শ্বাস ছাড়ছি। কেউ দিশেহারা হয়ে উদ্ভ্রান্ত মতো ছুটোছুটি করছি। সারাদেশে চলছে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা। এরমধ্যে বিরোধীদলের ডাকা হরতাল। শিক্ষার্থীদের চোখে দিশেহারার আতংকিত ছাপ। পিতা-মাতার চোখে বিবর্ণ ছাপ। সন্তানের লাশও দেখছেন কেউ কেউ। পথ চলতে ভয়, মিছিলে গেলে ভয়। চুপ থাকাটাও নির্মম অস্বস্তি। কারো পক্ষে কথা বলা যেন সে পক্ষের কট্টর সমর্থক বলে সমালোচনার তোপে পড়তে হচ্ছে আমাদের।
দেশের পরিস্থিতি বিভিন্নজনে ভিন্ন ভিন্ন মতামত প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ পান চিবুতে চিবুতে গল্পের ঝোকে বলছেন-দেশ আর দেশ নেই। দেশ পরিণত হয়েছে নারকীয় যন্ত্রনার নগরীতে। কেউ কেউ বলছেন-দেশের যা অবস্থা তাতে এই মুহুর্তে সেই তত্ত্বাধায়ক সরকার ফখরুদ্দিন সাবকে দরকার। যার দু’বছর শাসনামল ছিল স্বর্ণযুগের মতো। এত দাঙা হাঙ্গামা দেখতে ইচ্ছে করছে না। মন্তব্য ঝড়ের যেন শেষ নেই।
ফেসবুক, টুইটার, ব্লগসহ প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রিমিডিয়ায় ঝাঝালো শব্দ-বাক্যের ঝড়। চারদিক থেকে শিলাবৃষ্টির মতো ঝরছে সাধারণ মানুষদের মুখ থেকে কড়া উত্তপ্ত সব মন্তব্য। কেউ কেউ দেশের প্রধান দু’দলের দু’নেত্রীকেই দেখতে চাইছেন না। দুই নারীর চুল ছেঁড়াছিঁড়ির মত ঝগড়া, হিংসা, বাধাবাধিতে দেশের আজ এই করুণ অবস্থা! সংলাপের কোন আলাপ থাকলেও উদ্যোগের কোন আয়োজন নেই; ঝগড়া-ফ্যাসাদে এরা ওস্তাত এমন মন্তব্য করছেন কেউ কেউ!
টিভির টকশো ও চায়ের টেবিলে মন্তব্যের দৃশ্যটা বেশি দেখা যাচ্ছে। চারদিক থেকে আওয়াজের বাতাস ছড়াচ্ছে দেশটা কি গোল্লায় যেতে বসেছে নাকি? দেশটায় এখন সেনাবাহিনীর বিশেষ প্রয়োজন! এমন কঠিন চাওয়াও বাতাসে বাতাসে ছড়াচ্ছে। সে যাই হোক, চাওয়ারও যেমন শেষ নেই, মন্তব্যও তেমনি। নানা জনের নানা মন্তব্য নিয়ে সর্বমতের দেশ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ।
পত্রিকার পাতায় আর টিভির পর্দায় চোখ রাখলে নিজেকে এখন বিপন্ন প্রাণীদের মধ্যে তুলনা করতে হয়। কখন জানি রাস্তায় বের হতে গিয়ে কোন এক সাজানো ঘটনায় শিকার হই হত্যাকারীদের হাতে; নয়তো আইনশৃংখলাবাহিনীদের হাতে। কারণ আমি লেখালেখি করি। ব্লগে লেখালেখি করি। মুক্তলিপিতে মত প্রকাশ করি।
চলমান আন্দোলনগুলোর মধ্যে এখন হেফাজত ইসলামের দিকে টনক সবার। কী ঘটাতে যাচ্ছে হেফাজত ইসলাম? গত ৬ এপ্রিল ইসলাম বিদ্বেষী শাহবাগি ও কথিত নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে বৃহত্তর আন্দোলনের জন্য ঢাকার মতিঝিলে লংমার্চ করে। লক্ষ লক্ষ মুসল্লির সমাগম দেখে নিজেও অবিভূত হয়েছিলাম। এই একই তারিখ ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শাহবাগে ব্লগার এন্ড ফেসবুক এ্যাক্টিভিটি ফোরামের ডাকা গণজাগরণ থেকে প্রজন্ম আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়েছিল। মাঝখানে অতিবাহিত দুইমাস। তবে ভাল হয়েছে হেফাজত ইসলাম তাদের লংমার্চ হিসেবে মতিঝিল শাপলা চত্বরকে ইসলামী চত্ত্বর হিসেবে দীর্ঘায়িত করেনি। করলে হয়তো চরম দাঙ্গা হাঙ্গামার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো। রক্তপাত ঝরানোর আশংকা ছিল।
এখন রাজপথে চলছে চতুর্মুখী আন্দোলন। প্রজন্মের ৭১ এর যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি, হেফাজত ইসলামের ইসলাম বিদ্ধেষী নাস্তিক ব্লগারদের ফাঁসির দাবি, জামায়াতে ইসলামীর মানবতাবিরোধী অভিযোগের শীর্ষ নেতাদের নি:শর্ত মুক্তির জন্য আন্দোলন আর দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ফিরিয়ে আনার জন্য অবস্থান নেওয়া আন্দোলনে এখন রাজপথ চরমভাবে উত্তপ্ত। এই চতুর্মুখী আন্দোলন রাজপথকে কাঁপিয়ে তুলছেন তারা।
অপরদিকে সরকারপন্থীদের মাঠগরম করার মতো বিরোধীদল, জামায়াতকে প্রতিহত করতে শুরু করেছে গণহারে গ্রেফতার। ফেব্রুয়ারি থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব হতাহত, মারদাঙার ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে সেখানে ক্ষমতাসীন সরকারের অঙ্গ সংগঠন যুবলীগ ও ছাত্রলীগকে ত্রাস হিসেবে দেখা গেছে। গত বছর ৯ ডিসেম্বর/১২ তারিখে জামায়াতের ডাকা হরতালে নিরাপরাধ বিশ্বজীৎকে প্রকাশ্যে নৃশংসভাবে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছিল ছাত্রলীগ! ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখের মধ্যে প্রায় ৬৭ জন মারা যায়। আর এ পর্যন্ত প্রায় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে এসব সহিংস ঘটনার ফলে। এর উপর ভিত্তি করে দেশের অবস্থা চরম নাজুকতায় পৌছেছে বলে জনসাধারন এখন মুখ খুলতে দেখা গেছে। এবারের ভোট ব্যাংকে কোন দল জয়ী হবে সেটা নিয়ে প্রশ্নের বাক ঘুরছে চক্রবাক সাইকেলের মতোই।
চতুর্মুখী রাজনৈতিক সহিংস সাংঘর্ষিক অবস্থান থেকে বের হয়ে আসার কোন পথ নেই! নির্বাচনও এখন বেশ দেরি। এই সহিংস উত্তেজনাকর পরিবেশ ক্রমশ আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে এমন আশংকা করছেন অনেকে। সম্প্রতি নতুন শক্তি হেফাজত ইসলামের কথিত নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তির দাবিসহ ১৩ দফা দাবি আদায়ে রাজপথে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। প্রধান বিরোধীদলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের গণহারে গ্রেফতার জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। গত ৮ তারিখে হেফাজত ইসলামের ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতালে এক যুবলীগ নেতার প্রকাশে শর্টগানে গুলি ছুঁড়তে দেখা গেছে। দৈনিক সমকালের চট্টগ্রাম ব্যুরো তৌফিকুল ইসলাম বাবর এ রিপোর্টটিতে তুলে ধরেছেন ওই যুবলীগ নেতাকে ফিল্মের খলনায়ক রূপে। বাস্তবেও নাকি তিনি খলনায়ক সেটাও উল্লেখ হয়েছে ওই রির্পোটে।
এছাড়াও শতশত পুলিশের কাছাকাছি থেকে ওইভাবে প্রকাশ্যে গুলি ছোঁড়াটা পত্রিকার পাঠকরা ঘৃণার চোখে দেখেছে। এই ত্রাস করা দৃশ্য কারো কাম্য নয়; এছাড়াও পুলিশের গুলিতে অনেক মানুষ নিহত হয়েছেন এমন অভিযোগও রয়েছে। আবার রাজশাহীতে পুলিশের উপর চরম ওতরাও হয়েছিল কিছু শিবির। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে-ইট ও মাথার হেলমেট দিয়ে বেপরোয়াভাবে মারধরের লোমহর্ষক দৃশ্য। এই সহিংস দৃশ্য কারো কাম্য নয়।
বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক একটা দেশ। প্রত্যেকেই চায় শান্তি, নিরাপত্তা ও গর্ব করে বেঁচে থাকার। দেশের এই চরম উৎকন্ঠা, সহিংস রাজনীতির প্রভাব থেকে মুক্তি চান সবাই। আর এটা সম্ভব শান্তিপূর্ণ ও উদারচিত্ত নিয়ে আলোচনা। প্রচলিত শব্দে সংলাপ। আলোচনার মাধ্যমেই অনেক কঠিন পরিস্থিতিকে সমাধানে আনা সম্ভব। তা নাহলে এই সহিংসতা চলতে থাকলে দেশ যে গভীর এক নৈরাজ্য অন্ধকারের দিকে চলে যাবে তাতে সন্দেহ নেই; বলা যেতে পারে সেনাবাহিনীর হাতে বাধ্য হয়েই চলে যাবে দেশটা। হয়তো হতে পারে ওয়ান ইলিভেনের মত এক ভয়াবহ অবস্থা ফিরে আসলে দু’নেত্রীকেই এখন থেকে উন্নত আবাসন হিসেবে জেলখানাটা তৈরির করা প্রস্তুত থাকতে হবে এখনই।
১৫.০৪.১৩
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন