সাভারে ভবন ধসে নিহত ও আহত পরিবারের ক্ষয়-ক্ষতির দায়ভার কে নিবেন?
কি লিখব, কোন ভাষা প্রয়োগ করে সান্তনার বাণী পৌঁছে দিব আজ সাভারে ধ্বসে পড়া রানা প্লাজার বিধ্বস্ত নিহতদের কাছে। টিভির পর্দায়, ফেসবুকের পাতায় বসে বসে সাভারের আহাজারি আর্তনাত যেন কাছ থেকে শুনতে ছিলাম। সাভারে বাতাসে আজ লাশের গন্ধ ছড়াচ্ছে। আহাজারি স্বজনদের কন্ঠে কান্নার রোলে ভারি হয়ে উঠেছে পুরো প্রকৃতির চারপাশ।
টিভির পর্দায় লাইভ নিউজ দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি। গতকাল সকাল সাড়ে আটটায় ভবনটি ধসে পড়েছে। এ পর্যন্ত টিভি চ্যানেলের খবর অনুযায়ী ২০০ ছাড়িয়ে যাওয়া নিহতের খবরে স্তব্ধ সারাদেশ। উদ্ধারকৃত শ্রমিকদের মধ্যে অনেকে বলেছেন বহু শ্রমিক আটকা পড়ে আছেন। সকাল সাড়ে ৮টায় বড় একটি শব্দের মধ্য দিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে ভবনটি ধ্বসে পড়ে।
ধ্বসে পড়া ভবনটির চাপায় পড়ে হাজার হাজার শ্রমিক। চলছে উদ্ধার কাজ, জানা গেছে উদ্ধার কাজও শেষ করতে সময় লাগবে আরও দু’তিন দিন। তাহলে ধসে পড়ে ভবনটির চাপায় আটকে থাকা এখন পর্যন্ত যারা জীবিত আছেন, তাদের কি এ ক’দিন বাঁচিয়ে রাখা সম্বব হবে? স্বেচ্ছাসেবীরা বলছেন, পর্যাপ্ত অক্সিজেন প্রয়োজন, সে পরিমাণ অক্সিজেন তারা পাচ্ছেন না। উদ্ধার করতে ভবনটির ভিতরে দশ-পনের মিনিটের বেশি থাকা সম্ভব হচ্ছে না অক্সিজেনের অভাবে।
যে সকল স্বেচ্ছাসেবীরা সেখানে যাচ্ছেন আলো ও অক্সিজেনের অভাবে তারাও অসুস্থ্য হয়ে ফিরছেন। স্বজনদের কান্নার আহাজারিতে পুরো সাভারের আনাচে-কানাচে লোকারণ্য। স্বজনদের ভিড়, আর্তনাতের চিৎকারে যেন পর্বতসম ভারি হয়ে উঠেছে এখানকার আকাশ বাতাস। কারো পিতা, মা, বোন, ভাবি এবং প্রিয়তম স্ত্রী/স্বামী এই ধসে পড়া ভবনের চাপায় এখনো নিখোঁজ।
টিভির পর্দায় চোখ রাখা যায় না; কান্নায় ভেঙ্গে পড়তে হয়। তাহলে সাভারের এই ধসে যাওয়া ভবনটির আশে-পাশে চাপা পড়া,নিহত-আহতদের স্বজনদের কী অবস্থা হতে পারে সেটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়!
এদেশে বারবার আমাদের লাশের সারি দেখতে হয়। কেন দেখতে হয়, এ প্রশ্নের উত্তর কে দিবেন? উত্তর শোকবার্তা, কিছু আর্থিক সহযোগিতা ছাড়া আর কি হতে পারে? ট্রলার ডুবে লাশের স্তুপ, অগ্নিকান্ডে পুড়ে যাওয়া লাশ, ভয়াবহ আইলা, নারগিস, সাইক্লোন, সিডর প্রাকৃতিক দূর্যোগে লাশের সারি, রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে এত লাশ দেখতে দেখতে চরম শংকিত থাকতে হচ্ছে।
প্রাকৃতিক দূর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দেশের স্থপনার ভিত্তি শক্তিশালী জোরদার কথা বারবার বলা হচ্ছে। আজ সাভারের বহুতল নির্মাণ রানা প্লাজা ত্রুটিপূর্ন না হলে এতো তারাতারি সেটা ধসে পড়ার কথা ছিলো না। এই ভবনের মতো ঢাকায় আরও যে ভবন থাকতে পারে সেটা বিশ্বাস করে উপায় নেই। তাছাড়া রাজউকের অনুমোদনহীন স্থাপনাগুলো অতিসত্তর বাজেয়াপ্ত করা উচিত।
নইলে এরকম ভবন ধসে মরতে হবে কারখানার শ্রমিকদের। যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে দেশি-বিদেশী অর্থ অর্জন করা হয়। তাই হয়তো প্রখ্যাত গায়ক মনির খান গার্মেন্টসকর্মীদের নিয়ে গানটি গেয়েছিলেন-কোটি কোটি মানুষকে কাপড় পরাস/ আসে বিদেশি টাকা/ সে টাকায় বাড়ি হয় গাড়ী হয়/ ঘুরে যে দেশের ভাগ্যের চাকা/ সুই-সুতা দিয়ে তোরা সিলাই করিস/ দিন রাত রাত-দিনে তোরা খেটে মরিস/ তোরাই তো এদেশের সুনাগরিক।”
সেই সুনাগরিকদের আমরা আগুনে পুড়িয়ে, ভবন ধসে চাপা খাইয়ে হত্যা করছি! আজ সাভারের বহুতল নির্মাণ ধসে বিধস্ত হয়ে যাওয়া রানা প্লাজায় ছিল ৫টি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি ছিল। উদ্ধার হওয়া সামিউল নামে শ্রমিক জানান-ভবনটির ৩ তলা থেকে ৮ তলা পর্যন্ত ৫টি গার্মেন্টসে প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক কাজ করে। তবে টিভি মিডিয়া সূত্রে এসব ফ্যাক্টরিতে কর্মজীবির সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৬৩৮ জন। ধসে পড়া ভবনটি থেকে চলছে উদ্ধার কাজ। চলছে স্বেচ্ছাসেবিদের মানবিক পরিশ্রম।
সামাজিক যোগাযোগ সাইট ফেসবুকে প্রতি মিনিটে মিনিটে স্ট্যাটাস আপডেট হচ্ছে, টিভিতে এইমাত্র পাওয়া খবর শিরোনামে জানিয়ে দিচ্ছে। অক্সিজেন ও আলোর অভাবে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে জানা যাচ্ছে। অপরদিকে হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসায় মানবিকভাবে হাত বাড়িয়েছেন। রক্ত সংগ্রহ থেকে শুরু করে উদ্ধারকাজে যারা মহৎ মানবিকতার পরিচয় দিচ্ছেন তাদের কাজের কৃতজ্ঞতা করার ভাষায় এই মুহুর্তে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
সাভারের অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে রাখা হয়েছে সারি সারি নিহতদের লাশ। লাশের পাশে উপচে পড়া স্বজনদের ভিড়। কেউ নিয়েছেন তার প্রিয়জনের ছবি। সে কাজ করতো এই ধসে পড়া ভবনটির একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে। ছুটে এসেছেন খবর পাওয়ার সাথে সাথে। কেউ বাড়িতে আর্তনাতে বিলাপে বুক চাপরাচ্ছেন।
বেদনার করুণ বিলাপে চোখ থেকে ঝরাচ্ছে বিশাল সমুদ্রের চেয়েও লবণাক্ত পানি। এনাম মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে শ’শ উদ্ধারকৃতদের ভর্তি করা হয়েছে। সেখানে খোঁজ নিচ্ছেন স্বজনরা। ঘটনাস্থলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন তারা। উদ্ধারকৃত শ্রমিকদের বিক্ষুদ্ধ অভিযোগ গত ২৪ এপ্রিল ভবনটির একটি পিলারে ফাটল দেখা দিলে তারা ফ্যাক্টরিতে কাজ করতে অনীহা জানান।
কিন্তু মালিক সেটা অমান্য করে শ্রমিকদের চাকুরিচ্যুত করার ভয় দেখিয়ে বাধ্য করে ফ্যাক্টরিতে এনেছেন। জানা গেছে, এই ভবনটির মালিক বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের অঙ্গ সংগঠন যুবলীগের নেতা সোহেল রানা। শ্রমিকদের অভিযোগ, ফাটল ধরা ভবনে কাজ করতে অনীহা করলে চাকরিচ্যুত করার হুমকি দেন। এই বাণিজ্যিক শহরে একদিনে বসে থাকার সময় নেই।
তাই পেটের দায়ে তারা কাজে যোগ দিয়েছেন। সেই অনীহা বাস্তব হলো, ফাটল ধরা ভবন ধসে পড়লো সকাল সাড়ে আটটায়। বিভিন্ন ইলেক্ট্রি মিডিয়ার রির্পোটে জানা গেছে, ধ্বসে যাওয়া ভবনটি সদ্য নতুন। ত্রুটিপূর্ণ একটা ভবন। তাছাড়া রাজউক অনুমোদনহীন। প্রথমত জানা গিয়েছিল ভবনটি ৮ তালা বিল্ডিং, এখনা শোনা যাচ্ছে আর ৩ তলা রয়েছে।
এই রাজউক অনুমোদনহীন ৮/১১ তলা ত্রুটিপূর্ণ ভবনটির মালিকের চুড়ান্ত বিচার কামনা করছেন সবাই। স্থানীয় প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর নানক ও আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল আলম এই অর্থ পিশাচ মালিকদের শাস্তি কামনা করে ব্রিফিং দিয়েছেন। কিন্তু সেটা কতটা বাস্তবায়ন হবে সেটা ভাবার বিষয় আছে। কেননা গত বছর ২৫ নভেম্বর এই সাভারেই তাজরীন ফ্যাশনে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে সরকারি হিসেব মতো ১১১ জন নিহত হয়েছিল। ফ্যাক্টরির ত্রুটিপূর্ন ব্যবস্থাপনার মালিকপক্ষকে কতটা শাস্তি দিয়েছিলেন তা দেখা গেছে।
টিভির ক্যামেরার সামনে প্রধানমন্ত্রীসহ সব রাজনীতিবিদরা শোকবার্তা জানিয়েছেন, নিন্দা জানিয়েছেন। অনলাইন ফেসবুক,ব্লগ ও মিডিয়াসহ সর্বস্তরের মানুষ যেন দেশের এই অর্থ যোগানদাতা সুনাগরিকদের পাশে দাঁড়ান। আর এই অবৈধ ত্রুটিপূর্ন ভবন মালিকদের বিচারের আওতায় এনে ধসে পড়া ভবনের চাপায় পড়ে নিহত-আহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরনসহ সরকার ও রাজনৈতিক, সেচ্ছাসেবি প্রতিষ্ঠান তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসুন।
স্মরণকালে এমন ভয়াবহ ভবন ধসে পড়ায় বিপুল সংখ্যক মানুষের করুণ মৃত্যু কারও কাম্য নয় জানি, কিন্তু অর্থলোভের লেনদেন যদি এই অর্থপিশাচ মালিকদের বিচার করা না হয় তাহলে বুঝতে হবে, এদেশের জনসেবকরা মৃত্যুর ফাঁদ তৈরি করতেই ক্ষমতার জন্য লড়াই করেন!
২৬ এপ্রিল/১৩
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন