মঙ্গলবার, ৩০ এপ্রিল, ২০১৩

রাজনৈতিক কলাম

সাভার ট্রাজেডি : নারকীয় হত্যার দুয়ারে দেখছি লাশের মিছিল


বুধবার হতে চলছে সাভার জুড়ে শুধু শোকের মাতম। কান্নার আহাজারি, গগন বিদারি স্বজন হারানোর আর্তনাত। বাতাসে ছড়াচ্ছে ধসে যাওয়া ভবন পিষ্ট হওয়া লাশের র্দূগন্ধ। জীবিতরা ভিতর থেকে উদ্ধারের জন্য করছে করুণ আকুতি। উঠে আসছে উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের ভবন চাপায় পিষ্ট হওয়ার বীভৎষ বর্ণনা।
যা শুনলে শরীর ঝাকিয়ে উঠে। লোমকুপ জেগে উঠে। দু’চোখের জল বুক ভেঙ্গে ঝরণার মতো উদগত হয়। দৃশ্যমান আয়নায় ফুটে উঠে যদি আমি এই ভয়াবহ অবস্থায় উপনিত হতাম; কী অবস্থা হতো? যে ধসে যাওয়া ভবন মাটির সাথে মিশে গেছে। দেওয়াল, ছাদ ধসে চাপা দিয়েছে হাজার হাজার শ্রমিকদের। কী ভয়ংকর অবস্থা! প্রাকৃতিক দূর্যোগ হলে একটা কথা ছিল। ৬/৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলেও একটা ব্যাপার থাকতো।
কিন্তু সেটা হয়নি, এমনি এমনি ধসে পড়লো। ভয়াল এক মৃত্যুকুপে গ্রাসে পরিণত করলো হাজার হাজার কর্মজীবি শ্রমিকদের। যাদের কায়িক পরিশ্রমের অর্থ দিয়ে এই বিলাস বহুল ঢাকা শহরে বড় বড় ইমারত গড়ে উঠা। ২ তালা থেকে শুরু করে ৩..৪..৯..২২ তলা সুদৃশ্য দালান কোঠা। যেখানে বিলাসবহুল জীবন কাটায় শ্রমিকের রক্তচোষা একশ্রেনীর ক্ষমতাসীন মানুষরা।
আর শ্রমিকরা কাজ করে জীর্ণশীর্ণ, দূর্বল সব বিল্ডিংগুলোতে। যেখানে জীবন নাশের প্রবল ভয়, যেকোন দূর্ঘটনায় শিকার হওয়ার থাকে উপক্রম। জীর্ণ-দূর্বল ইমারত ধসে পড়লে মালিকের তো আর ক্ষতি নেই। তার থাকার বিলাসবহুল ভবনটা আর ভাঙছে না। শ্রমিকরা তো মশা কিংবা মাছির সমতুল্য। থাপ্পর দিলে মেরে ফেলা যায়, কোন কৈফিয়ত দিতে হয়না।
কিছু শ্রমিক মারা গেলে আফছোস কিসের? নতুন শ্রমিক দিয়ে কাজ শুরু হবে। কিন্তু এদের তো কোন স্বজন এই শ্রমিক হয়ে এই মর্মান্তিক মৃত্যুর শিকার হয়না। এই শ্রেনীর মানুষদেরই আমরা দেবতার মত পুজা করি। পা ধরে খেয়ে পড়ার জন্য পা ধরি। চাকরির জন্য হাত বাড়াই। হায়রে এই পাষন্ড হৃদয়, সিমেন্ট-কংক্রিটের মিশ্রণেই গড়ে উঠা মন। টাকার জোরে হাওয়া উড়েন।

রাজনৈতিক কলাম

আমরা কি ভয়াবহ দুর্যোগের দিকে এগুচ্ছি!

ঘটনার দিকে তাকালে যেন ফোসকা পড়ে যাচ্ছে দুচোখে। ঝলসে যাওয়ার মতো অনুভব হচ্ছে সমস্ত শরীর ও হৃদপিন্ড। কোথায় গিয়ে দাঁড়ালে নিরাপত্তা পাওয়া যাবে? বাক স্বাধীনতায় কথা বলা যাবে? সে পরিস্থিতি এখন আর নেই। বর্তমান সময়টাকে মনে হচ্ছে সিডর কিংবা নার্গিস ঝড়ের তান্ডবের চেয়েও ভয়াবহ আঘাত হানা প্রলংকরী থাবা। এটা দ্বিপদী মানুষের থাবা। জাতি শত্রুদের থেকে বেঁচে থাকা খুব কঠিন। সেই ক্ষেত্রে এদেশের সাধারন জনগণ যেন প্রবেশ করছে অনিশ্চিত এক ভয়াবহ অন্ধকার জগতের দিকে। চারদিকে ঝলসে দেওয়া আগুনের লেলিহান শিখা। ঘর পুড়ছে,গাড়ি পুড়ছে,ধর্মিকদের মন্দির পুড়ছে আর পাখির মতো গুলি খেয়ে ধপাধপ ঝরে পড়ছে সাধারণ জনগণের লাশ।
প্রশ্ন ওঠে-এটা কি অকারণে মানুষ হত্যার দেশ? এটা কি ধ্বংসযজ্ঞের রাষ্ট্র!! বলতে দ্বিধা নেই; নিশ্চিত আমরা এখন ভয়াবহ অগ্নিকুপের দিকে পৌঁছে যাচ্ছি। এটাই আমাদের জন্য দুনিয়াবি জাহান্নাম! মহান সৃষ্টিকর্তা রাগান্বিত হয়ে অদৃশ্য থেকে ছুঁড়ে দিতে যাচ্ছেন অভিশপ্ত গজব! বোঝা কঠিন আজকের দিনের পর কালকের দিনটিতে কি ঘটতে যাচ্ছ?
মনে হচ্ছে বিশাল ভয়ংকর এক কৃষ্ণ গহবর আমাদের দিকে হা করে গিলে খেতে দাজ্জালের মতো ধেয়ে আসছে। আমরা পালাতে চেষ্টা করছি কিন্তু বেড়িতে পড়ে যাচ্ছি হন্টক কিংবা আইন শৃংখলাবাহিনীর হাতে। তদন্ত পরে, রিমান্ডে শারিরিক ও মানসিক অত্যাচারের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। কেননা মিথ্যার ফাঁদে পড়লে মিথ্যা মামলায় এসবের ভোগান্তিতে পড়তে হবে এতে কোন সন্দেহ নেই।
হরতালে দেশের অবস্থা বারটার জায়গা তেরটা। অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি; জানমালের অনিরাপত্তা, বাজারের উর্ধ্বগতি আর জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে ভীষণ এক মহা যন্ত্রণা নির্ভর পরিস্থিতিতে সময় কাটাচ্ছি। কেউ কেউ হা-করে নি:শ্বাস ছাড়ছি। কেউ দিশেহারা হয়ে উদ্ভ্রান্ত মতো ছুটোছুটি করছি। সারাদেশে চলছে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা। এরমধ্যে বিরোধীদলের ডাকা হরতাল। শিক্ষার্থীদের চোখে দিশেহারার আতংকিত ছাপ। পিতা-মাতার চোখে বিবর্ণ ছাপ। সন্তানের লাশও দেখছেন কেউ কেউ। পথ চলতে ভয়, মিছিলে গেলে ভয়। চুপ থাকাটাও নির্মম অস্বস্তি। কারো পক্ষে কথা বলা যেন সে পক্ষের কট্টর সমর্থক বলে সমালোচনার তোপে পড়তে হচ্ছে আমাদের।
দেশের পরিস্থিতি বিভিন্নজনে ভিন্ন ভিন্ন মতামত প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ পান চিবুতে চিবুতে গল্পের ঝোকে বলছেন-দেশ আর দেশ নেই। দেশ পরিণত হয়েছে নারকীয় যন্ত্রনার নগরীতে। কেউ কেউ বলছেন-দেশের যা অবস্থা তাতে এই মুহুর্তে সেই তত্ত্বাধায়ক সরকার ফখরুদ্দিন সাবকে দরকার। যার দু’বছর শাসনামল ছিল স্বর্ণযুগের মতো। এত দাঙা হাঙ্গামা দেখতে ইচ্ছে করছে না। মন্তব্য ঝড়ের যেন শেষ নেই।
ফেসবুক, টুইটার, ব্লগসহ প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রিমিডিয়ায় ঝাঝালো শব্দ-বাক্যের ঝড়। চারদিক থেকে শিলাবৃষ্টির মতো ঝরছে সাধারণ মানুষদের মুখ থেকে কড়া উত্তপ্ত সব মন্তব্য। কেউ কেউ দেশের প্রধান দু’দলের দু’নেত্রীকেই দেখতে চাইছেন না। দুই নারীর চুল ছেঁড়াছিঁড়ির মত ঝগড়া, হিংসা, বাধাবাধিতে দেশের আজ এই করুণ অবস্থা! সংলাপের কোন আলাপ থাকলেও উদ্যোগের কোন আয়োজন নেই; ঝগড়া-ফ্যাসাদে এরা ওস্তাত এমন মন্তব্য করছেন কেউ কেউ!
টিভির টকশো ও চায়ের টেবিলে মন্তব্যের দৃশ্যটা বেশি দেখা যাচ্ছে। চারদিক থেকে আওয়াজের বাতাস ছড়াচ্ছে দেশটা কি গোল্লায় যেতে বসেছে নাকি? দেশটায় এখন সেনাবাহিনীর বিশেষ প্রয়োজন! এমন কঠিন চাওয়াও বাতাসে বাতাসে ছড়াচ্ছে। সে যাই হোক, চাওয়ারও যেমন শেষ নেই, মন্তব্যও তেমনি। নানা জনের নানা মন্তব্য নিয়ে সর্বমতের দেশ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ।
পত্রিকার পাতায় আর টিভির পর্দায় চোখ রাখলে নিজেকে এখন বিপন্ন প্রাণীদের মধ্যে তুলনা করতে হয়। কখন জানি রাস্তায় বের হতে গিয়ে কোন এক সাজানো ঘটনায় শিকার হই হত্যাকারীদের হাতে; নয়তো আইনশৃংখলাবাহিনীদের হাতে। কারণ আমি লেখালেখি করি। ব্লগে লেখালেখি করি। মুক্তলিপিতে মত প্রকাশ করি।
চলমান আন্দোলনগুলোর মধ্যে এখন হেফাজত ইসলামের দিকে টনক সবার। কী ঘটাতে যাচ্ছে হেফাজত ইসলাম? গত ৬ এপ্রিল ইসলাম বিদ্বেষী শাহবাগি ও কথিত নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে বৃহত্তর আন্দোলনের জন্য ঢাকার মতিঝিলে লংমার্চ করে। লক্ষ লক্ষ মুসল্লির সমাগম দেখে নিজেও অবিভূত হয়েছিলাম। এই একই তারিখ ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শাহবাগে ব্লগার এন্ড ফেসবুক এ্যাক্টিভিটি ফোরামের ডাকা গণজাগরণ থেকে প্রজন্ম আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়েছিল। মাঝখানে অতিবাহিত দুইমাস। তবে ভাল হয়েছে হেফাজত ইসলাম তাদের লংমার্চ হিসেবে মতিঝিল শাপলা চত্বরকে ইসলামী চত্ত্বর হিসেবে দীর্ঘায়িত করেনি। করলে হয়তো চরম দাঙ্গা হাঙ্গামার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো। রক্তপাত ঝরানোর আশংকা ছিল।
এখন রাজপথে চলছে চতুর্মুখী আন্দোলন। প্রজন্মের ৭১ এর যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি, হেফাজত ইসলামের ইসলাম বিদ্ধেষী নাস্তিক ব্লগারদের ফাঁসির দাবি, জামায়াতে ইসলামীর মানবতাবিরোধী অভিযোগের শীর্ষ নেতাদের নি:শর্ত মুক্তির জন্য আন্দোলন আর দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ফিরিয়ে আনার জন্য অবস্থান নেওয়া আন্দোলনে এখন রাজপথ চরমভাবে উত্তপ্ত। এই চতুর্মুখী আন্দোলন রাজপথকে কাঁপিয়ে তুলছেন তারা।
অপরদিকে সরকারপন্থীদের মাঠগরম করার মতো বিরোধীদল, জামায়াতকে প্রতিহত করতে শুরু করেছে গণহারে গ্রেফতার। ফেব্রুয়ারি থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব হতাহত, মারদাঙার ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে সেখানে ক্ষমতাসীন সরকারের অঙ্গ সংগঠন যুবলীগ ও ছাত্রলীগকে ত্রাস হিসেবে দেখা গেছে। গত বছর ৯ ডিসেম্বর/১২ তারিখে জামায়াতের ডাকা হরতালে নিরাপরাধ বিশ্বজীৎকে প্রকাশ্যে নৃশংসভাবে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছিল ছাত্রলীগ! ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখের মধ্যে প্রায় ৬৭ জন মারা যায়। আর এ পর্যন্ত প্রায় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে এসব সহিংস ঘটনার ফলে। এর উপর ভিত্তি করে দেশের অবস্থা চরম নাজুকতায় পৌছেছে বলে জনসাধারন এখন মুখ খুলতে দেখা গেছে। এবারের ভোট ব্যাংকে কোন দল জয়ী হবে সেটা নিয়ে প্রশ্নের বাক ঘুরছে চক্রবাক সাইকেলের মতোই।
চতুর্মুখী রাজনৈতিক সহিংস সাংঘর্ষিক অবস্থান থেকে বের হয়ে আসার কোন পথ নেই! নির্বাচনও এখন বেশ দেরি। এই সহিংস উত্তেজনাকর পরিবেশ ক্রমশ আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে এমন আশংকা করছেন অনেকে। সম্প্রতি নতুন শক্তি হেফাজত ইসলামের কথিত নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তির দাবিসহ ১৩ দফা দাবি আদায়ে রাজপথে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। প্রধান বিরোধীদলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের গণহারে গ্রেফতার জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। গত ৮ তারিখে হেফাজত ইসলামের ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতালে এক যুবলীগ নেতার প্রকাশে শর্টগানে গুলি ছুঁড়তে দেখা গেছে। দৈনিক সমকালের চট্টগ্রাম ব্যুরো তৌফিকুল ইসলাম বাবর এ রিপোর্টটিতে তুলে ধরেছেন ওই যুবলীগ নেতাকে ফিল্মের খলনায়ক রূপে। বাস্তবেও নাকি তিনি খলনায়ক সেটাও উল্লেখ হয়েছে ওই রির্পোটে।
এছাড়াও শতশত পুলিশের কাছাকাছি থেকে ওইভাবে প্রকাশ্যে গুলি ছোঁড়াটা পত্রিকার পাঠকরা ঘৃণার চোখে দেখেছে। এই ত্রাস করা দৃশ্য কারো কাম্য নয়; এছাড়াও পুলিশের গুলিতে অনেক মানুষ নিহত হয়েছেন এমন অভিযোগও রয়েছে। আবার রাজশাহীতে পুলিশের উপর চরম ওতরাও হয়েছিল কিছু শিবির। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে-ইট ও মাথার হেলমেট দিয়ে বেপরোয়াভাবে মারধরের লোমহর্ষক দৃশ্য। এই সহিংস দৃশ্য কারো কাম্য নয়।
বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক একটা দেশ। প্রত্যেকেই চায় শান্তি, নিরাপত্তা ও গর্ব করে বেঁচে থাকার। দেশের এই চরম উৎকন্ঠা, সহিংস রাজনীতির প্রভাব থেকে মুক্তি চান সবাই। আর এটা সম্ভব শান্তিপূর্ণ ও উদারচিত্ত নিয়ে আলোচনা। প্রচলিত শব্দে সংলাপ। আলোচনার মাধ্যমেই অনেক কঠিন পরিস্থিতিকে সমাধানে আনা সম্ভব। তা নাহলে এই সহিংসতা চলতে থাকলে দেশ যে গভীর এক নৈরাজ্য অন্ধকারের দিকে চলে যাবে তাতে সন্দেহ নেই; বলা যেতে পারে সেনাবাহিনীর হাতে বাধ্য হয়েই চলে যাবে দেশটা। হয়তো হতে পারে ওয়ান ইলিভেনের মত এক ভয়াবহ অবস্থা ফিরে আসলে দু’নেত্রীকেই এখন থেকে উন্নত আবাসন হিসেবে জেলখানাটা তৈরির করা প্রস্তুত থাকতে হবে এখনই।
১৫.০৪.১৩

আলোকিত মানুষ

তেঁতুলিয়ায় কবির আকন্দ যেন আলোর প্রদীপ


পৃথিবীর প্রতিদিনের ভোরের মতো এখানেও ভোর হয়। প্রতিদিনকার মতো নব সাজে সূর্যদয় হয়। নতুন আলোয় নতুন রূপ নেয়। সেই নব সূর্যের মতো উদয়ন ঘটেছে বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের উপজেলা তেঁতুলিয়ায়। তেঁতুলিয়ার উত্তরে দাঁড়িয়ে আছে আকাশ ছোঁয়া হিমালয় পর্বত। সৌন্দর্য্যরে নয়না হিসেবে কাঞ্চনজঙা ও নদী মহানন্দার বিধৌত রূপমাধুর্য্য। তেঁতুলিয়া চৌরাস্তা বাজারের সোজা দক্ষিণে বয়ে গেছে ভারতের ভিতর সোজা কলকাতার রাস্তাটা। এখানে এখন তিন দিকে বিস্তৃত চোখ জুড়ানো চা বাগানের অনাবিল বিস্মৃত দৃশ্য মন ভুলিয়ে দেওয়ার মতো। প্রকৃতির এই নান্দনিক সৌন্দর্য্যকে হার মানায় কিছু আলোকিত মানুষের কর্মগুণের পরশ ছোঁয়ায়। তেঁতুলিয়া চৌরাস্তা বাজার হতে মাত্র দেড় কিলোমিটার দুরে জেমকন গ্রুপের প্রতিষ্ঠান কমলা বাগান।। পাশেই বিস্তৃত ফরেস্ট। প্রতিদিন ভোরে যখন প্রাত:ভ্রমনে বের হই, তখন হাটতে হাটতে চলে যাই এই কমলা বাগানের দিকে। এখানে বসার জন্য একটা গোল ছাউনি আছে, সাথে অফিস। বেশ পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, লাগানো কিছু সুগন্ধি ফুলের গাছ আছে। আছে দেহ-মন জুড়ানোর পুবের বিশুদ্ধ বাতাস। ঝিরি ঝিরি দখিনা হিমেল হাওয়া। এখানে আসলে যে কারও মন ফুরফুরে ভরে যাবে সজীব প্রফুল্লতায়।
সকাল সাতটা-আটটার দিকে নজরে পড়ে কিছু খুদে শিশুদের দল। তাদের হাতে নানান প্রচ্ছদে জ্ঞান নির্ভর বইগুচ্ছ। কোথায় যাচ্ছ জিজ্ঞেস করতেই বলে উঠে-কবির আংকেলের কাছে। কবির আংকেল! শিশুদের মুখে মুখে এই একটি নাম চারদিকে গুঞ্জনে গুঞ্জনে মুখরিত। ছোট ছোট হৃদয়ে স্বচ্ছ-নির্মল ভালবাসায় অঙ্কিত হয়েছে কবির আংকেলের বাক্যটি। এ যেন অথৈ সাগরের বুকে জলরাশির উপর ভাসমান শুভ্র ফেনায় আঁকা পবিত্র বন্ধনের মমতায় গাঁথায় সিক্ত ভালবাসা। এদের চোখে কবির আংকেল একজন প্রিয় বন্ধু, একজন অবিভাবক, একজন পিতা একজন গ্রেট আংকেল। খুব কাছের মানুষ, হৃদয়ের স্থান নেওয়া প্রিয় মানুষ। চোখের সামনে পড়লেই বাতাসের বেগে ছুটে আসে শিশুরা কবির আংকেলের কাছে। কবির আংকেল..কবির আংকেল আমাদের কবির আংকেল এই দৃশ্যটা অনেকবার অবাক হয়েছি । অবিভুত হয়েছি শিশুদের চোখে, মনে কতটুকু ভালোবাসলে এই পরিমাণ শ্রদ্ধা-প্রেম পাওয়া যায়! প্রত্যেক মানবতাবোধ সুন্দর মনের উত্তম পুরস্কার হলো স্বর্গতুল্য প্রেম।
এবার আসুন কবির আংকেলের একটু পরিচয়টা জেনে নিই-
নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা থানায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। সংসারে ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সপ্তম। বাবাকে হারিয়েছেন বেশ স্কুল জীবনেই। বড় ভাই মোহাম্মদ আলী আকন্দ ও ভাবি ড.সানজিদা রেবার পরম স্নেহে মমতায় বড় হয়েছেন। বড় ভাই ও ভাবী জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধণ্য শিক্ষক। দেশের এই শীর্ষ বিদ্যার্জনকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞানে মাস্টার্স করেন। ভূগোলের চারপাশে এই হৃদয়বান তারুণ্যের চোখ যেন খুঁজে বেড়াতো সমাজের অসমতা, নির্মমতা ও হতদরিদ্রদের জীবনের বাস্তব জীবনের দৃশ্য। হৃদয়ে দাগ কাড়তো যখন চোখের সামনে দেখতে পেতেন কেউ অসুস্থ রোগী টাকার অভাবে চিকিৎসা নিতে পারছে না; সংসারের অভাব অনটনের কারণে শিশুটি স্কুলে যেতে পারছে না; প্রচন্ড শীতের কাপুঁনিতে থকথক করে দাঁতে দাতে কাঁমড় দিচ্ছে শীতার্ত মানুষরা। চোখের সামনে ভেসে উঠতো এইসব মানুষের পাশে কী করে দাঁড়ানো যায়। তাঁদের নূন্যতম সহযোগিতার হাত বাড়ানো যায়। আর এসব তথ্য সম্প্রতি কবির আকন্দের কাছ থেকেই জেনেছি।
দেশের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করে ২০০৮ সালে তেঁতুলিয়া উপজেলার কাজী এন্ড কাজী টি এস্টেট-কর্মস্থলে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি এই প্রতিষ্ঠানেরই সীমান্তবর্তী দর্জিপাড়া গ্রামে ডিভিশন প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
গত বছর শেষের দিকে কবির আকন্দের সাথে প্রথম পরিচয় ঘটে আমার । প্রথম পরিচয়েই বুঝতে পারি তাঁর মধ্যে সুন্দর একটা উদার চিত্তের একটা মানবিক মন রয়েছে। দর্জিপাড়া আমার নিজ এলাকায় হওয়ায় তাঁর ভুয়সী প্রশংসায় আমি প্রচন্ড অবিভুত হয়েছি। অনেকে বলেছেন দর্জিপাড়া, কানকাটা ও সারিয়ালজোত গ্রামের এখানকার অনাথ এতিম, দু:স্থ ও প্রতিবন্ধী শিশুদের সঙ্গে তার গভীর বন্ধুর্ত। এলাকার প্রায় শিশুই কবির আংকেলের স্নেহের ভালবাসায় সিক্ত। প্রতিটি মহৎ কাজই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে যুগ থেকে যুগ। মানুষ মানুষের জন্য। জীবন জীবনের জন্য। জীবনে প্রেম-ভালবাসার গুরুত্ব অপরিসীম। সেই ভালবাসার জ্বাজ্বল্যমান প্রমাণ এই একজন কবির আকন্দ।
এখানকার মানুষের মুখে মুখে কবির আকন্দের নাম। কী পরিমাণ ভালবাসা দিতে পারলে এই সুনাম অর্জন করা যায়! যা অর্জন করেছেন এই তারুণ্যের অহংকার কবির আকন্দ। তাঁর কাছ থেকেই জানতে পারলাম, তিনি এখনকার স্কুল পড়–য়া শিশুদের জন্য গড়ে তুলেছেন শিশু স্বর্গ পাঠাগার। শিশুদের বিনোদনের জন্য বাড়িয়ে দেন সহযোগিতার হাত। শিশুদের নিয়েই যেন তার সব আনন্দ-উৎসব।
নিজের বেতনের ১০ শতাংশ থেকে আর্তমানবতায় সেবার উদ্দেশে ব্যয় করেন শিশুদের লেখাপড়ার জন্য কাগজ-কলম, বই পুস্তক, মেধাবিকাশের বৃত্তি প্রদান এবং ঈদের নতুন পোশাক ও হাড় কাঁপা শীতের গরম কাপড়। শিশুদের নিয়ে সুযোগ পেলেই যেমন আড্ডায় মেতে উঠেন, সেই আড্ডায় নিজের মুখের মমতাময়ীর খাবার থেকে তুলে দেন প্রত্যেক শিশুর মুখে মুখে। এই সালের ইংরেজি শুভ নববর্ষের ২ তারিখে দর্জিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করে শিশুদের মাঝে শীতবস্ত্র ও মেধাবিকাশের বৃত্তি প্রদান করেন তিনি। অনুষ্ঠানে ছিলেন সদ্য বদলী হওয়া পুলিশ সুপার শাহরিয়ার রহমান, পঞ্চগড় মহিলা কলেজের সহ অধ্যাপক তৌহিদুল বারি, প্রথম আলো জেলা প্রতিনিধি শহিদুল ইসলাম, এনটিভির হোসাইন রায়হান, দৈনিক আমার দেশ উপজেলা প্রতিনিধি আব্দুল বাসেতসহ তেঁতুলিয়া উপজেলার স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। অনুষ্ঠানে প্রথম আলো ব্লগার ও তরুণ সাহিত্যিক হিসেবে আমিও ছিলাম।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তাদের প্রধান অতিথি পঞ্চগড় মহিলা কলেজের সহ.অধ্যাপক তৌহিদুল বারি বলেন-এ এলাকার জন্য কবির আকন্দ একটা মডেল। এরকম কবির আকন্দের প্রতি ঘরে ঘরে প্রয়োজন। খুব আপ্লুত হয়েছি যে, শিশুদের মুখে মুখে কবির আংকেল ডাকটি। নিজেকে আজ অপমানিত মনে হচ্ছে এই কারণে, কেন আমি কবির আকন্দের মতো একজন হতে পারলাম না”। প্রথম আলোর শহিদুল ইসলাম বলেন, প্রত্যেক সৃষ্টিশীলতাই সুনাম অর্জন করে। কবির আকন্দ সেই সুনামের অর্জনকারী। আজকের অনুষ্ঠানে শিশুদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরন ও বৃত্তি প্রদান আমাকে খুব অবিভূত করলো। সত্যি কবির আকন্দ তেঁতুলিয়ার জন্য এক সাদা মনের আদর্শ মডেল’। অনুষ্ঠানে অন্যান্য বক্তাদের বক্তব্য খুব মনোযোগ ও স্তব্ধ হয়ে শুনেছিলাম। সত্যিই অনুষ্ঠানে বসে দু’চোখের ভাসমান আয়নায় দেখেছি এরকম একটা প্রদীপের সব এলাকার জন্য দরকার। যেখান থেকে শতশত প্রদীপ জ্বলে পুরো জাতিকে আলোর পথ দেখাবে। জ্ঞাতব্য করবে প্রকৃত মানবতাবোধের মাহাত্ম।
গত ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখে এক আলাপচারিতায় এ আলোর প্রদীপকে জিজ্ঞেস করেছিলাম মানুষের জন্য আর কি স্বপ্ন, এসব কিভাবে করে যাচ্ছেন? উত্তরে তিনি মৃদু হাসি টেনে বললেন-মানুষ হয়ে যদি মানুষের জন্য কিছু করতে না পারলাম, তাহলে মানুষ হয়ে জন্মানোর স্বার্থকতা কিসের? মানুষের মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মতো বেঁচে থাকার প্রকৃত স্বার্থকতা নেই। তার কাছ থেকে জানতে পারলাম, ইতিমধ্যে তিনি এ এলাকার বেশ কিছু বেকার তরুণের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন তার বন্ধুদের সাহচর্যের মাধ্যমে।
তেঁতুলিয়াকে কেমন লাগে প্রশ্ন করলে জানান-তেঁতুলিয়া বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের উপজেলা একটি শান্তিপ্রিয় এলাকা। প্রাকৃতিক নিবির সৌন্দর্য আর এখানকার মানুষজন বেশ মানবিক। তবে এখানে শিক্ষার হার বাড়লেও বেকারদের কর্মসংস্থান করতে পারলে আধুনিক মডেল হিসেবে গড়ে উঠতো স্বপ্নের এই তেঁতুলিয়া। উত্তর বঙ্গের এই বৃহৎ প্রতিষ্ঠান জেমকন গ্রুপ দর্জিপাড়া ডিভিশন প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের মধ্যে এই আর্তমানবতার হাত বাড়িয়েছে এতে আপনার প্রতিষ্ঠানের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কোন প্রতিবন্ধকতার প্রভাপ পড়ে কীনা জানতে চাইলে বলেন-‘আমার উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আমাকে এসব সামাজিক কাজে উৎসাহ দেন। এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করে নিজেকে গর্ববোধ করি কারণ ২০০৪ সালের পর থেকে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি। কিন্তু ২০০৮ সালে এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে এসে বুঝতে পারি আমার কোম্পানীর মালিকবর্গ মানবিকভাবে সৎ ও সুশিক্ষায় শিক্ষিত। শোষণ কি জিনিস তারা জানে না। সৎভাবে ব্যবসা করে বিশ্ব দরবারে কাজী এ্যান্ড কাজীর নাম ছড়িয়ে পড়েছে। ভাল পণ্য তৈরি করে মানুষের কাছে পৌছে তারা পাশাপাশি মানব কল্যাণ, সমাজ উন্নয়নের কাজে সর্বদা অগ্রণী ভূমিকা রেখে চলেছেন’।
ঠিক তাই কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট অর্থাৎ জেমকন গ্রুপের দর্জিপাড়া ডিভিশনে ক’দিন আগে অফিসে বসে কবির আকন্দের সাথে কথা বলার সময় হঠাৎ কাজী শাহেদ আহমেদের একটা বার্তা নজরে পড়লো। বার্তা ছিল এরুপ-“প্রথম কথা হচ্ছে, যারা কাজকে লড়ু মনে করবে না, তারা পারবে না। যারা শুধু চাকরিই করবে তারাও পারবে না। যারা প্রকৃতির সাথে একাত্ম হতে পারবে না, তারাও পারবে না। কাজকে মনে করতে হবে লড়ু এবং সেটা বহলড়ু করতে হবে। পৎবধঃ করতে হবে; ঢ়ৎড়ধপঃরাব হতে হবে। অপেক্ষা করলে সময় শুধু বয়ে যাবে, সময়ের সাথে থাকতে হবে সৃষ্টির নেশায়”। এই বার্তাই জানিয়ে দেয় শিল্প-সাহিত্যের যাদের মন আছে, ভালবাসা আছে তাদের মনুষত্ব প্রাচুর্য্যের মতো বিশাল। এই বিশাল মনুষ্যত্বের দাবিদার জেমকন গ্রুপ প্রতি বছর শিল্প সাহিত্যের উপর অপার সম্মান রেখে ‘জেমকন সাহিত্য পুরস্কার’ প্রদান করে থাকেন। এ বছরও তারা সাহিত্য পুরস্কার দিবে জানিয়ে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রকাশিত বই ও তরুণ লেখকদের কাছ থেকে পান্ডুলিপি পাঠানোর আহবান জানিয়েছেন। প্রত্যেক সৃষ্টিশীল মানুষদের মন সব সময় উদার থাকে। মানবিক দৃষ্টিতে এরা অনন্য ভূমিকা রাখেন। যা জেমকন গ্রুপকে প্রশংসা জানাচ্ছি।
সৃষ্টি কালচার, মানবিক ধর্ম যার মধ্যে নিহিত তিনি একসময় মহা মনিষীতে পরিণত হোন। সেদিন শুনেছিলাম দর্জিপাড়ায় এক শিশু অসুস্থতায় ভুগতে ছিল। সে তার মাকে বলেছিল-‘মা কবির আংকেলকে বলো আমি অসুস্থ, উনি শুনলেই আমার কাছে ছুটে আসবেন। আমাকে ঔষধ কিনে দিবেন,আদর করবেন আমি ভাল হয়ে যাব’। ভালবাসার কি অপূর্ব নিদর্শন! যা ভাবতে গেলে অবাক না হয়ে পারা যায় না; স্বচক্ষে দেখলে এমন মণিষীকে শ্রদ্ধা না করে ফিরে আসা যায় না। সেই অসম ভালবাসা অর্জন করেছেন এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আলোর মডেল কবির আকন্দ। তিনি গড়ে তুলেছেন জ্ঞানের সমুদ্রাস্থান হিসেবে প্রায় তিনশতাধিক বই নিয়ে শিশু স্বর্গ পাঠাগার। বই পড়লে জ্ঞান বাড়ে, অজানাকে জানা যায়। অন্ধ চোখে ফুটে উঠে জ্ঞানের আলোর প্রদীপ। আর সেই অন্ধজনের আলো জ্বালানোর জন্য একদিকে তিনি গড়েছেন পাঠাগার, অনাথ, দারিদ্র শিশুদের জন্য বই,খাতা-কলম এবং শিক্ষা বৃত্তি তুলে দিচ্ছেন পরম আপন স্বরুপ একজন পিতা,অভিভাবক হয়ে।
একটা শিশুকে জন্ম দেওয়া যায়, কিন্তু সেই শিশুকে মানুষ করতে খুবই কঠিন। তাই এ এলাকার এমনকি তেঁতুলিয়ার উপজেলার অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ আছেন, তাদের আছে অঢেল অর্থ সম্পদ, কিন্তু মানবিক দৃষ্টি থেকে পিছিয়ে রেখেছেন পর্দার আড়াল করে। তাদেরকে অন্তত এই আলোর প্রদীপ কবির আকন্দকে চোখ খুলে দেখা দরকার। যদি নিজের পক্ষে সে কাজ সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তত যতটুকু সম্ভব সহযোগিতার হাত প্রয়োজন। শিশু পাঠাগার সম্পর্কে জানতে চাইলে-কবির আকন্দ বলেন, এখানে আশে পাশে কয়েক শতক জমি কিনে পাঠাগারটি স্থাপন করতে পারলে ভালো হতো। একটা পাঠাগারের পর্যাপ্ত বইয়ের দরকার। সে তুলনায় তেমন সংগ্রহ করতে পারিনি। ইচ্ছে আছে যদি আলাদা জমি কিনে পাঠাগারটি স্থাপন করতে পারি তাহলে এই পাঠাগারে শুধু বই-ই থাকবে না; থাকবে বেশ কটি কম্পিউটার। যাতে এখানকার শিশু থেকে শুরু করে কলেজ ভার্সিটির পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা এখানে এসে সেবা পায়।
অত্যাধুনিক এই প্রযুক্তি জগতের সাথে পরিচিত হয়। ঠিক তাই, সময় গড়ায়। বলার থাকে আরও অনেক কিছু। কিন্তু বলা হয়ে উঠে না। একটা জ্বলন্ত প্রদীপ থেকে কোটি কোটি প্রদীপে বাতি নিলে যেমন এর শেষ নেই; ঠিক তেমনি একজন জ্ঞানীবান চোখ থেকে অগণিত অন্ধচোখ আলো নিলেও এর ব্যতিক্রম হবে না।
২০ এপ্রিল/১৩

রাজনৈতিক কলাম

সাভারে ভবন ধসে নিহত ও আহত পরিবারের ক্ষয়-ক্ষতির দায়ভার কে নিবেন?


কি লিখব, কোন ভাষা প্রয়োগ করে সান্তনার বাণী পৌঁছে দিব আজ সাভারে ধ্বসে পড়া রানা প্লাজার বিধ্বস্ত নিহতদের কাছে। টিভির পর্দায়, ফেসবুকের পাতায় বসে বসে সাভারের আহাজারি আর্তনাত যেন কাছ থেকে শুনতে ছিলাম। সাভারে বাতাসে আজ লাশের গন্ধ ছড়াচ্ছে। আহাজারি স্বজনদের কন্ঠে কান্নার রোলে ভারি হয়ে উঠেছে পুরো প্রকৃতির চারপাশ।
টিভির পর্দায় লাইভ নিউজ দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি। গতকাল সকাল সাড়ে আটটায় ভবনটি ধসে পড়েছে। এ পর্যন্ত টিভি চ্যানেলের খবর অনুযায়ী ২০০ ছাড়িয়ে যাওয়া নিহতের খবরে স্তব্ধ সারাদেশ। উদ্ধারকৃত শ্রমিকদের মধ্যে অনেকে বলেছেন বহু শ্রমিক আটকা পড়ে আছেন। সকাল সাড়ে ৮টায় বড় একটি শব্দের মধ্য দিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে ভবনটি ধ্বসে পড়ে।
ধ্বসে পড়া ভবনটির চাপায় পড়ে হাজার হাজার শ্রমিক। চলছে উদ্ধার কাজ, জানা গেছে উদ্ধার কাজও শেষ করতে সময় লাগবে আরও দু’তিন দিন। তাহলে ধসে পড়ে ভবনটির চাপায় আটকে থাকা এখন পর্যন্ত যারা জীবিত আছেন, তাদের কি এ ক’দিন বাঁচিয়ে রাখা সম্বব হবে? স্বেচ্ছাসেবীরা বলছেন, পর্যাপ্ত অক্সিজেন প্রয়োজন, সে পরিমাণ অক্সিজেন তারা পাচ্ছেন না। উদ্ধার করতে ভবনটির ভিতরে দশ-পনের মিনিটের বেশি থাকা সম্ভব হচ্ছে না অক্সিজেনের অভাবে।
যে সকল স্বেচ্ছাসেবীরা সেখানে যাচ্ছেন আলো ও অক্সিজেনের অভাবে তারাও অসুস্থ্য হয়ে ফিরছেন। স্বজনদের কান্নার আহাজারিতে পুরো সাভারের আনাচে-কানাচে লোকারণ্য। স্বজনদের ভিড়, আর্তনাতের চিৎকারে যেন পর্বতসম ভারি হয়ে উঠেছে এখানকার আকাশ বাতাস। কারো পিতা, মা, বোন, ভাবি এবং প্রিয়তম স্ত্রী/স্বামী এই ধসে পড়া ভবনের চাপায় এখনো নিখোঁজ।
টিভির পর্দায় চোখ রাখা যায় না; কান্নায় ভেঙ্গে পড়তে হয়। তাহলে সাভারের এই ধসে যাওয়া ভবনটির আশে-পাশে চাপা পড়া,নিহত-আহতদের স্বজনদের কী অবস্থা হতে পারে সেটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়!
এদেশে বারবার আমাদের লাশের সারি দেখতে হয়। কেন দেখতে হয়, এ প্রশ্নের উত্তর কে দিবেন? উত্তর শোকবার্তা, কিছু আর্থিক সহযোগিতা ছাড়া আর কি হতে পারে? ট্রলার ডুবে লাশের স্তুপ, অগ্নিকান্ডে পুড়ে যাওয়া লাশ, ভয়াবহ আইলা, নারগিস, সাইক্লোন, সিডর প্রাকৃতিক দূর্যোগে লাশের সারি, রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে এত লাশ দেখতে দেখতে চরম শংকিত থাকতে হচ্ছে।
প্রাকৃতিক দূর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দেশের স্থপনার ভিত্তি শক্তিশালী জোরদার কথা বারবার বলা হচ্ছে। আজ সাভারের বহুতল নির্মাণ রানা প্লাজা ত্রুটিপূর্ন না হলে এতো তারাতারি সেটা ধসে পড়ার কথা ছিলো না। এই ভবনের মতো ঢাকায় আরও যে ভবন থাকতে পারে সেটা বিশ্বাস করে উপায় নেই। তাছাড়া রাজউকের অনুমোদনহীন স্থাপনাগুলো অতিসত্তর বাজেয়াপ্ত করা উচিত।
নইলে এরকম ভবন ধসে মরতে হবে কারখানার শ্রমিকদের। যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে দেশি-বিদেশী অর্থ অর্জন করা হয়। তাই হয়তো প্রখ্যাত গায়ক মনির খান গার্মেন্টসকর্মীদের নিয়ে গানটি গেয়েছিলেন-কোটি কোটি মানুষকে কাপড় পরাস/ আসে বিদেশি টাকা/ সে টাকায় বাড়ি হয় গাড়ী হয়/ ঘুরে যে দেশের ভাগ্যের চাকা/ সুই-সুতা দিয়ে তোরা সিলাই করিস/ দিন রাত রাত-দিনে তোরা খেটে মরিস/ তোরাই তো এদেশের সুনাগরিক।”
সেই সুনাগরিকদের আমরা আগুনে পুড়িয়ে, ভবন ধসে চাপা খাইয়ে হত্যা করছি! আজ সাভারের বহুতল নির্মাণ ধসে বিধস্ত হয়ে যাওয়া রানা প্লাজায় ছিল ৫টি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি ছিল। উদ্ধার হওয়া সামিউল নামে শ্রমিক জানান-ভবনটির ৩ তলা থেকে ৮ তলা পর্যন্ত ৫টি গার্মেন্টসে প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক কাজ করে। তবে টিভি মিডিয়া সূত্রে এসব ফ্যাক্টরিতে কর্মজীবির সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৬৩৮ জন। ধসে পড়া ভবনটি থেকে চলছে উদ্ধার কাজ। চলছে স্বেচ্ছাসেবিদের মানবিক পরিশ্রম।
সামাজিক যোগাযোগ সাইট ফেসবুকে প্রতি মিনিটে মিনিটে স্ট্যাটাস আপডেট হচ্ছে, টিভিতে এইমাত্র পাওয়া খবর শিরোনামে জানিয়ে দিচ্ছে। অক্সিজেন ও আলোর অভাবে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে জানা যাচ্ছে। অপরদিকে হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসায় মানবিকভাবে হাত বাড়িয়েছেন। রক্ত সংগ্রহ থেকে শুরু করে উদ্ধারকাজে যারা মহৎ মানবিকতার পরিচয় দিচ্ছেন তাদের কাজের কৃতজ্ঞতা করার ভাষায় এই মুহুর্তে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
সাভারের অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে রাখা হয়েছে সারি সারি নিহতদের লাশ। লাশের পাশে উপচে পড়া স্বজনদের ভিড়। কেউ নিয়েছেন তার প্রিয়জনের ছবি। সে কাজ করতো এই ধসে পড়া ভবনটির একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে। ছুটে এসেছেন খবর পাওয়ার সাথে সাথে। কেউ বাড়িতে আর্তনাতে বিলাপে বুক চাপরাচ্ছেন।
বেদনার করুণ বিলাপে চোখ থেকে ঝরাচ্ছে বিশাল সমুদ্রের চেয়েও লবণাক্ত পানি। এনাম মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে শ’শ উদ্ধারকৃতদের ভর্তি করা হয়েছে। সেখানে খোঁজ নিচ্ছেন স্বজনরা। ঘটনাস্থলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন তারা। উদ্ধারকৃত শ্রমিকদের বিক্ষুদ্ধ অভিযোগ গত ২৪ এপ্রিল ভবনটির একটি পিলারে ফাটল দেখা দিলে তারা ফ্যাক্টরিতে কাজ করতে অনীহা জানান।
কিন্তু মালিক সেটা অমান্য করে শ্রমিকদের চাকুরিচ্যুত করার ভয় দেখিয়ে বাধ্য করে ফ্যাক্টরিতে এনেছেন। জানা গেছে, এই ভবনটির মালিক বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের অঙ্গ সংগঠন যুবলীগের নেতা সোহেল রানা। শ্রমিকদের অভিযোগ, ফাটল ধরা ভবনে কাজ করতে অনীহা করলে চাকরিচ্যুত করার হুমকি দেন। এই বাণিজ্যিক শহরে একদিনে বসে থাকার সময় নেই।
তাই পেটের দায়ে তারা কাজে যোগ দিয়েছেন। সেই অনীহা বাস্তব হলো, ফাটল ধরা ভবন ধসে পড়লো সকাল সাড়ে আটটায়। বিভিন্ন ইলেক্ট্রি মিডিয়ার রির্পোটে জানা গেছে, ধ্বসে যাওয়া ভবনটি সদ্য নতুন। ত্রুটিপূর্ণ একটা ভবন। তাছাড়া রাজউক অনুমোদনহীন। প্রথমত জানা গিয়েছিল ভবনটি ৮ তালা বিল্ডিং, এখনা শোনা যাচ্ছে আর ৩ তলা রয়েছে।
এই রাজউক অনুমোদনহীন ৮/১১ তলা ত্রুটিপূর্ণ ভবনটির মালিকের চুড়ান্ত বিচার কামনা করছেন সবাই। স্থানীয় প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর নানক ও আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল আলম এই অর্থ পিশাচ মালিকদের শাস্তি কামনা করে ব্রিফিং দিয়েছেন। কিন্তু সেটা কতটা বাস্তবায়ন হবে সেটা ভাবার বিষয় আছে। কেননা গত বছর ২৫ নভেম্বর এই সাভারেই তাজরীন ফ্যাশনে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে সরকারি হিসেব মতো ১১১ জন নিহত হয়েছিল। ফ্যাক্টরির ত্রুটিপূর্ন ব্যবস্থাপনার মালিকপক্ষকে কতটা শাস্তি দিয়েছিলেন তা দেখা গেছে।
টিভির ক্যামেরার সামনে প্রধানমন্ত্রীসহ সব রাজনীতিবিদরা শোকবার্তা জানিয়েছেন, নিন্দা জানিয়েছেন। অনলাইন ফেসবুক,ব্লগ ও মিডিয়াসহ সর্বস্তরের মানুষ যেন দেশের এই অর্থ যোগানদাতা সুনাগরিকদের পাশে দাঁড়ান। আর এই অবৈধ ত্রুটিপূর্ন ভবন মালিকদের বিচারের আওতায় এনে ধসে পড়া ভবনের চাপায় পড়ে নিহত-আহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরনসহ সরকার ও রাজনৈতিক, সেচ্ছাসেবি প্রতিষ্ঠান তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসুন।
স্মরণকালে এমন ভয়াবহ ভবন ধসে পড়ায় বিপুল সংখ্যক মানুষের করুণ মৃত্যু কারও কাম্য নয় জানি, কিন্তু অর্থলোভের লেনদেন যদি এই অর্থপিশাচ মালিকদের বিচার করা না হয় তাহলে বুঝতে হবে, এদেশের জনসেবকরা মৃত্যুর ফাঁদ তৈরি করতেই ক্ষমতার জন্য লড়াই করেন!
২৬ এপ্রিল/১৩

রাজনৈতিক কলাম

নোংড়া রাজনীতির ছোবলে লাশের স্তুপে স্বজনদের কান্নার আহাজারিতে বিয়োগান্ত প্রকৃতি


প্রতিদিনকার মতো ভোরে উঠে রান্নাবান্নার শেষে গা’গোসল করে সকাল আটটার দিকে দলে দলে কাজে ফিরছিল গার্মেন্টস কর্মীরা। কে জানতো আজই তাদের শেষ দিন! জীবনের অস্ত নিভে যাবে কঠিন শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায়! ধ্বংসলীলায় ধসে পড়বে তাদের কর্মস্থল ৯ তলা ভবনটি?
কিন্তু আশংকা ছিল, মনে ভয়ও জেগে উঠেছিল। মনটা কাজে যেতে চায়নি কিছুতেই। কারণ কি? কোন কিছু ঘটার পূর্বে মনটা প্রথম সিগন্যাল দেয়। সেই সিগন্যালটা দিয়েছিল এদেরও। গত মঙ্গলবার তাদের প্রিয় কর্মস্থল রানা প্লাজার ভবনটির ৩য় তলা ফাটল ধরা দেখা দেয়। এমনিতে ঢাকা পৃথিবীর বিপজ্জনক শহরদের মধ্যে অন্যতম।
যে কোন শক্তিশালী প্রাকৃতিক দূর্যোগে ভুপাতিত হয়ে যেতে পারে এ শহরের অট্টালিকার মত ইমারতগুলো। ভূমিকম্পনে ধসে সমতল ভূমিতে পরিণত হতে পারে এমন হলুদ সিগন্যালও এসেছে বিশ্ব আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে। সে কারণে ভয়ের মাত্রাটা ছিল শঙ্কা দেওয়ার মত। শ্রমিকরা এই ফাটলধরা ভবনে কাজে আসতে অনীহা জানালে ক্ষিপ্ত হয় মালিকপক্ষ।
এক পিলারে ফাটল ধরলে ভয়ের কিছু নেই অনিশ্চিত শান্তনাবানী দেন তারা। তারপরেও শ্রমিকদের শংকা, যদি কিছু হয়ে যায়! এবার মালিকপক্ষের চোখে ঝরে আগ্নেগিরির হুমকি-ধামকির বারুদ। চাকরিচ্যুত করার হুমকি। এই জনবহুল শহরে নতুন আরেকটা চাকরি নিতে অনেক ঘুরতে হয়। বাসায় বসে থাকতে হয়। গার্মেন্টসের অধিকাংশ নারী।
তাই পুরুষদের তুলনায় নারী শ্রমিকদের বেতনও কম। তার মধ্যে বসে থাকাও সমস্যা। পেটের দায়ে মা-বাবা তথা পরিবার ছেড়ে এই যানজট শহরে বসবাস। ধুলোবালি আর যান্ত্রিকতার যাতাকলে জীবনকে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে যেন যন্ত্রমানবে। তাই নানা চিন্তাফিকির করে ঘর থেকে বের হয় শ্রমিকরা কাজে যোগ দিতে। সকাল ৮টায় মনে শঙ্কা নিয়েও কাজে যোগ দেয়। হাজিরা খাতায় সই করে স্ব-স্ব ইউনিটে কাজ শুরু করে। প্রতিদিনকার মতো কাজ করতেছিল তারা।
গল্পে, কথা-বার্তায় কাটে পুরো দিনের মতো সারা মাস-বছর। কিন্তু হঠাৎ করেই কেমন যেন বিকট একটা শব্দ হলো। সেই শব্দের কয়েক মিনিটের মধ্যেই গুড়ুম করে ধসে পড়লো তাদের মাথার ওপর কংক্রিটের গড়া ভারি ছাদটা। চুন-দেওয়ালের চাপায় পিষ্ট হলো তারা। বিদ্যুতহীন গুমোট অন্ধকার। ইলেক্ট্রিসিটির তার ছিঁড়ে একাকার।
ভবনের ভিতর থেকে আটকে পড়াদের চিৎকার-কে আছ, আমাদের বাঁচাও। বধির হয়ে চাপা দিয়ে থাকে ধসে পড়া ছাদ। বাতাসহীন ভিতরকার ভয়ংকর শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ। আওয়াজ বের হচ্ছে না; আর্তনাতের প্রতিধ্বণি ফিরে আসে কিন্তু উদ্ধারকারীর কারোও দেখা মেলে না। আস্তে আস্তে দম বন্ধ হয়ে আসে বাতাসের অভাবে।
চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সাভারের রানা প্লাজা ভবন ধসে পড়ে আটকা পড়েছে হাজার হাজার শ্রমিক। উদ্ধারের জন্য ছুটে আসে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। আস্তে আস্তে জনারণ্য হয়ে উঠতে থাকে ঘটনাস্থল। এদিকে বিরোধীদলের ডাকা হরতাল। দুপুর হয়ে আসে। সাভার পরিণত হয় জনস্রাতে। এ স্রাতে কোন মিছিল সমাবেশের নয়; এ জনস্রাতে কোন লংমার্চের নয়।
এ জন স্রাতে স্বজন হারানোর বেদনায় একত্র হওয়া। স্বজনদের খুঁজে বের করে কাটে টেনে নেওয়ার। দু’চোখের জল আছরে ফেলার। এক মহা মৃত্যুকুপে আটকা পড়েছে প্রিয়জনরা। যে যেভাবে পারছে উদ্ধার কাজে নেমে পড়ছেন। সামাজিক যোগাযোগ সাইট ফেসবুকে স্ট্যাটাসে ভরে যায়। সাভারে রানা প্লাজা ধস! হাজার হাজার পোশাক কর্মী আটকা পড়েছে। ঢাকার আশে পাশে যারা আছেন তারা যেন উদ্ধার কাজে অংশ নিয়ে মহান মানবতার পরিচয় দেন।
সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধারকৃত আহতদের চিকিৎসার জন্য কোন কোন গ্রুপের রক্তের প্রয়োজন সেটা স্ট্যাটাসে মিনিটে মিনিটে আপডেটে জানিয়ে দিচ্ছেন ফেসবুক বন্ধুরা। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এ খুদে বার্তা। ইতিমধ্যে টিভি চ্যানেল লাইভ শুরু করে দিয়েছে। টিভির পর্দায় ঢাকার বাইরের লোক ভিড় করে জন স্রাতের মতোই। সরাসরি সম্প্রচারে ফুটে উঠে ধসে পড়া ভবনের করুণ দৃশ্য।
স্বজনদের গগন বিধারী আর্তনাত। বিধ্বস্ত ভবনের ভিতর থেকে মুষ্টিমেয় কয়েকজন সুস্থ হয়ে বের হতে পেরেছিলেন। এই ভবনে রয়েছে ৫টি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি। এসব ফ্যাক্টরিতে কাজ করে হাজার হাজার পোশাক শ্রমিক। এখানে কেউ কেউ স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন, আত্মীয়ের মধ্যে কেউ এবং কাজের সাথে সম্পৃক্ত সবাই আপন।
সেই আপনদের মধ্যে যাদের উদ্ধার করা হয়েছে, তারা বর্ণনা করেছে ধসে পড়া ভবনের ভিতরকার মৃত্যুকুপের ভয়াবহ অবস্থা। চোখ থেকে আর্তনাতের বৃষ্টি ঝরছে। বুক চাপড়ে বলছেন তাদের প্রিয়জনরা আটকা পড়েছেন।
বেঁচে আছেন কীনা জানা নেই, তাদের উদ্ধার করুন বলেই আবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন। কেউ খুঁজে পাচ্ছেন না তার সদ্য বিয়ে করা প্রিয়তম স্ত্রীকে। কেউ তার বোন ও ভাইকে। কান্নার জলে বেদনার বিবর্ণ রঙে সাভার হয়ে উঠে যেন এক শোকাহত মৃত্যুনগরী!
উপচে পড়া এনাম মেডিকেল হাসপাতালের চত্বর। বিকেলের দিকে অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে শুইয়ে রাখা হয় উদ্ধারকৃত নিহতদের সারি সারি লাশ। স্মরণকালে এ বিস্ময়কর মালিকপক্ষের অবহেলায় সাভার ট্রাজেডি অশ্রুসজল চোখে দেখছেন বিশ্বও। করুণ মৃত্যুর গীতারে সূর। স্বজনদের বুক চাপড়ানো বিকট কান্নার আকুতি।
আমার বাজানরে এনে দাও, আমার ভাইকে খুঁজে পাচ্ছিনা, এই যে তার ছবি দেখুন দেখুন…..; টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকরাও মজা নিচ্ছেন আহদের সাক্ষাতকার নিয়ে। যশোরের এক যুবক কয়েকদিন আগে কুলসুম নামের মেয়েকে বিয়ে করে একই গার্মেন্টস চাকরি করছিলেন। ভবন ধসের পর তাকে খুঁজে পাচ্ছেন না টিভি চ্যানেলকে জানালে সেটাই বারবার প্রচার করছিলেন। যখনই কাউকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে সেখানেই স্বজনদের জমে ভিড়। তাদের কেউ কীনা?
কী সম্পর্কের আত্মিক টান! সহানুভুতির হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন অনেকেই। জায়গায় জায়গায় রক্ত সংগ্রহের জন্য ক্যাম্প বসানো, পানি খাওয়ানোর ব্যবস্থা। সরকারি-বেসরকারিভাবে অ্যাম্বুলেন্স, ডাক্তারদের চিকিৎসা সেবাসহ বাড়িয়েছেন সমর্মিতার হাত। মানুষ মানুষের জন্য। জীবন জীবনের জন্য। কিন্তু ভবনের মালিক ও গার্মেন্টস এর মালিকরা কি সে গুরুত্ব দিয়েছিল?
৩ তলা ভবনের ফাটল দেখা দিলে শ্রমিকরা কাজে আসতে চায়নি। কিন্তু তাদের চাকরিচ্যুত করার ভয় দেখিয়ে জোর করে কাজে বাধ্য করিয়েছেন তাদের। এই ট্রাজেডির হত্যাকান্ডের দায় তারা কিভাবে শোধ করবেন? প্রতিটি নিহত শ্রমিকদের জীবনের মূল্য ২০ হাজার করে টাকা আর আহত শ্রমিকদের ৫ হাজার টাকা এমন আর্থিক সাহায্য করে? শ্রমিকদের জীবনের মূল্য কি এতই তুচ্ছ! তাদের হত্যা করে কিছু আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে শোধ হয়ে যাবে?
যে শ্রমিকদের শরীরের ঘামঝরা পরিশ্রমে দেশি-বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হয়। যাদের শরীরের ঘাম দিয়ে এদেশের গাড়ী হয়, বাড়ী হয় সেই শ্রমিকদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা? স্মরণকালের এই ভয়াবহ ভবন ধসের ট্রাজেডির নিহতদের পরিবার বয়ে বেড়াবেন স্বজন হারানোর বেদনা। আহতরা হয়তো বেঁচে থাকবেন জীর্ণশীর্ণ অবস্থা নিয়ে। কেউ পঙ্গু হয়ে পরিবারের অভিশাপ আর হয়তো তাকে দ্বারে দ্বারে ভিখেরি হয়ে চলতে হবে সারাটা জীবন।
এখনো চলছে উদ্ধার কাজ। ফেসবুকের পাতায় দেখছি মিনিটে মিনিটে বন্ধুদের দেওয়া নিউজ আপডেট। কেউ ঘটনাস্থল থেকে দিচ্ছেন, আবার কেউ টিভির সংবাদ শুনে দিচ্ছেন। অনেক ফেসবুকার রয়েছে যারা বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রি মিডিয়ার সাংবাদিকতার সাথে জড়িত। তাদের নিউজ আপডেটে জানা যাচ্ছে,এখনো অনেক জীবিত আটকা পড়ে আছেন। রাত ১২টা পর্যন্ত নেটেই ছিলাম।
ফেসবুকে অনেকে অনেক মমতায় নিয়ে লিখছেন। কেউ কেউ সহযোগিতার জন্য স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এখন পর্যাপ্ত শুকনো খাবার, ঔষুধপত্রের প্রয়োজন। সহমর্মিতার জন্য সহযোগিতা চাচ্ছেন আর্ত্ম‌মানবতাপ্রেমী স্বেচ্ছাসেবীরা। এই এনাম মেডিকেল কলেজের হাসপাতালের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও ডাক্তাররা ঢেলে দিচ্ছেন পূর্ণ মানবিকতার সেবা।
এ কলেজ হাসপাতালের শিক্ষার্থীরা ২০০ ব্যাগ রক্ত দিয়েছেন, আশেপাশে মাদ্রাসার ছাত্ররাও রক্ত দেওয়ার জন্য লাইন ধরে দাঁড়িয়েছিলেন। বিভিন্ন স্পটে রক্তসংগ্রহ কর্মসূচিতে স্বেচ্ছায় সেবায় শ্রম দিয়েছেন প্রথম আলো বন্ধুসভাসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। এই যে ভালবাসা, জীবন বাঁচানোর জন্য মানবতার সেবাব্রতীদের কৃতজ্ঞতার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে শরীরের লোম জেগে উঠে।
দেবতার মতো পুঁজো দিতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু এই দৃশ্য কি এদেশের ক্ষমতাসীন সরকারের সাংসদরা চোখ তুলে দেখছেন? গতকাল এই ভয়াবহ ট্রাজেডির উদ্ধারকাজে না এসে অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সংযতহীন বাক্যলাপ শুনে কষ্ট হয়েছে। যেখানে হাজার সাধারণ মানুষ নেমে পড়েছে উদ্ধার কাজে। প্রধানমন্ত্রী প্রেসব্রিফিংয়ে বলেছেন, টকশোতে বড় বড় কথা না বলে উদ্ধার কাজে অংশ নিন। টিভির ক্যামেরায় কথা বলা যায় কিন্তু মানবতায় হাত বাড়াতে কষ্ট হয় এমন নজিরও দেখলাম।
এক ফেসবুকের বন্ধু আক্ষেপ করে স্ট্যাটাস জানালেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ব্লগার রাজীব হায়দার শুভ’র হত্যাকান্ডের পর তার বাসায় গিয়েছিলেন। শহীদ বলে ঘোষণাও দিয়েছিলেন। কিন্তু সাভারের এ ভয়ানক ভবন ধসের ট্রাজেডির মৃত্যুস্তুপ দেখতে আসলেন না। আসার কথাও নয়, হেফাজত ইসলামকে রুখতে গার্মেন্টস কর্মী নারীদের প্রয়োজন হয়। কিন্তু সেই গার্মেন্টসকর্মী নারীরা ভবন ধসে মৃত্যুকুপে পিষ্ট হয়ে আছে, এখন তাদের প্রয়োজন হয়।
রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা নাকি এখন দলের কেউ নন। সাভার থেকে পৌর শহর যুবলীগের তালিকা নিয়ে সংগ্রহ করে সংসদে জানালেন, রানা যুবলীগের কেউ নন। কী আশ্চর্য ! সাভার থানা যুবলীগের আহ্বা‌য়ক হিসেবে সাভারের রাজপথে হাজারও ব্যানার, ফেস্টুন টাঙ্গানো আছে। এটাকে তিনি অস্বীকার করলেন! ঠিকই অস্বীকার করেছিলেন ৯ ডিসেম্বর/১২ বিশ্বজীৎ দাসকে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা প্রকাশে রাজপথে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে নৃশংশভাবে খুন করার পরেও তারা ছাত্রলীগের কেউ ছিলেন না।
অদ্ভূত এদেশের রাজনীতি ! ফরমালিনে মেশানো অন্ধ বিবেক। বিবর্জিত প্রেম-ভালবাসা। মৃত্যুর দায়ভার গ্রহণ করতে এ রাষ্ট্র পরিচালকরা যেন রাজী নন। ট্রাজেডির পর শোকবার্তা জানিয়েই জনমঞ্চে, প্রেসব্রিফিং ও টিভির ক্যামেরার সামনে সমবেদনা জানিয়ে মিথ্যা অভিনয়ে চকচকে রুমাল দিয়ে চোখ মুছবেন। মানবতার প্রেমের দুয়ারে যাদের কাটাতারের অর্থের লোভ ও স্বার্থেরবেড়া তাদেরকে বিপন্ন মানবতার করুণ চিত্র বুঝানো নিস্ফল কাজ।
সাভার এই ভয়াল ট্রাজেডির পোশাক শ্রমিক হত্যার দায় তারা নিবেন এটা নিস্ফল কল্পনা মাত্র। তাই হয়তো এ যুগের সত্যভাষী সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফ সাভার ট্রাজেডি। ‘মালিকের জন্য দায়মুক্তি জাতির জন্য শোক’ কলামে বলেছেন-‘নারায়নগঞ্জের প্যানটেক্স গার্মেন্টর মালিকের কিছু হয়নি। চট্টগ্রামে আগুনে অঙ্গার অজস্র‌ শ্রমিকের মালিকেরও কিছু হয়নি।
তাঁরা দেশের মালিক, আইনের মালিক, এমনকি অধীনে কর্মরত শ্রমিকদের জীবন-মৃত্যুর মালিকদের ম্যানেজার (প্র.আ.২৫এপ্রিল)।’ ঠিক গতবছর তাজরীন ফ্যাশনে অগ্নিদগ্ধ শ্রমিকদের মালিকেরও কিছু হয়নি। হবেও না; অর্থের কাছে বিবেকের দরজায় লাগানো তালা। আজ সাভারে ভবন ধসে আটকা পড়া শ্রমিকদের উদ্ধার করতে যত যন্ত্রপাতির অভাব। অথচ জাতীয় সংসদটা যদি এমনভাবে ধসে পড়ে তিনশ জন সাংসদের এমন অবস্থা হতো তাহলে কি যন্ত্রপাতির অভাবের কথা উঠতো!
যতদিন এ নষ্ট রাজনীতি ও অন্ধ বিবেক দিয়ে দেশ চালিত হবে ততোদিন লাশের স্তুপে স্বজনদের হারানোর যন্ত্রনার ভিতর সময় কাটাতে হবে। যত দূর চোখ যায়, ততো দূর পর্যন্ত শুধু লাশের সারিই চোখে পড়বে। হয়তো সেদিন সোনার বাংলাদেশ নাম অ্যাফিডিভিট করে রাখা হবে লাশের দেশ বাংলাদেশ।
২৭ এপ্রিল/১৩